Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

স্কুলে পড়ি সে সময় দেখেছি ক্লাশে ফার্স্ট সেকেন্ড প্লেস নিয়ে দুই মেয়ের মধ্যে ব্যাপক কলহ। দুই মেয়ের মধ্যে বলা হলেও ভুল হবে, সেই কলহের সাথে মেয়েদের মায়েরাও যুক্ত ছিলো। সারা স্কুল ক্যাম্পাসে শোরগোল শুরু হয়ে গিয়েছিলো। সেইসব ঘটনা বৃত্তান্ত জানার আগ্রহ হয়নি কখনও, জানতেও চাই না। তো মোটামুটি শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম ক্লাশে। প্লেস নিয়ে কামড়াকামড়ি করতে হবে এরকম ধারনা কেউ মনে ঢুকিয়ে দেয়নি, কিংবা নিজের থেকেও আসেনি। তো ক্লাশ নাইনে থাকতে পড়ালেখার দিকে একটু বেশী গুরুত্ব রেখে মা কিছু টিউটর ঠিক করে ফেলে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেইসব জায়গায় যেতে হবে ভাবতেই শরীর অবশ হয়ে আসে আমার। তো সেই সময় আমার মা জানায়, সেইসব টিউটরদের সাথে কথা বলার সময় আমারই ক্লাশের এক ছাত্রীর মা নাকি তাকে জানিয়ে দিয়েছে, ব্যাচগুলো হবে ক্যাটাগরি ভাগ করে। এখানে A, B, C এরকম ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পাঠদান হবে। মাকে নাকি সেই মহিলা ইঙ্গিত করেছে আমি A ক্যাটাগরিতে পড়িনা, যেখানে কিনা তার মেয়ে A ক্যাটাগরিতেই পড়ে। সেই মহিলার কথার কোন উত্তর না দিয়ে মা আমার কানে ঢুকিয়ে দিলো সেটা, এবং আমাকে জানালো তার বিশ্বাস তার মেয়ে A ক্যাটাগরিতেই পড়ে! আমি থতমত খেয়ে যাই, তো সেইসব টিউটরদের ব্যাচে গিয়ে দেখি ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে ব্যাচ করা যেখানে বয়েজ স্কুলের প্লেস পাওয়া পোলাপানও আছে। না চাইতেও সবার সামনে খারাপ পারফর্ম করার সুযোগ ছিলোনা। শিক্ষক সব হাত ধরে সমাধান করে দিতেন, নিজ থেকে কোন চিন্তাই করতে হতো না। তো সেইগুলা বুঝতে যেহেতু সমস্যা হতোনা, তাই দেখা গেলো টেস্টে, ক্লাশ পরীক্ষায় ভালোই করতে থাকলাম। এর আগে একটা কোচিং সেন্টারে যেতাম, সেখানকার এক শিক্ষক ছিলো যে কিনা একটা সমস্যা ধরিয়ে দিয়ে নিজে নিজে তার সমাধান বের করতে বলতেন। সেই সময়টা মাথা খাটানোর সুযোগ ছিলো, অনেক সময় আর কিছু না পারলেও বসে বসে সাতপাঁচ চিন্তাও করা যেতো। হাতে ধরে সব করার ফলে সব সহজ হয়ে গেলেও নিজে কোন কিছু সমাধান করার তৃপ্তি মিলতো না। নতুন টিউটর পেয়ে রেজাল্ট ভালো হতে লাগলো কিন্তু মনে মনে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হতে শুরু করলো। আত্নবিশ্বাস কমে গেলো, নিজে থেকে কিছু করার ক্ষমতাও লোপ পেলো। কারন মনে মনে এক ধরণের ধারনা জন্মাতে শুরু করে তাহলো সফল হওয়ার তরিকাই হলো passive learning, নিজ থেকে কোন কিছুর সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা আর যাই হোক সফলতার গ্যারান্টি দেয় না। যদিও এর মধ্যে যতটুকু সম্ভব নিজের মতো করে শেখা জিনিসে একটু আলাদা পদ্ধতি ব্যাবহার করে সুখ পেতাম। এরই এক ফাঁকে দূর সম্পর্কের এক চাচার ওখানে ফ্রিতে টিউশনের অফার আসলো, আমার বড় বোন এমনকি সম্ভবত দুই একজন কাজিনও তার ওখানে কিছুদিন গিয়েছিলো। ফ্রিতে পাওয়া সুযোগ হাত ছাড়া করতে নেই বলেই আমাকেও যেতে হলো তার কাছে। সেখানে গিয়ে আরেক ধরণের অভিজ্ঞতা হলো। লোকটি ছিলো পেশায় ব্যাংকার, হিসাবে খুব পাকা। জ্যামিতির উপপাদ্য থেকে একটা সমস্যা সমাধান করতে দিলো আমাকে। আমি করলাম কি আমার মতো করে ত্রিভুজ ABC এর জায়গায় অন্য অক্ষর বসিয়ে সেটা প্রমাণ করে দিলাম। কিন্তু তাতে সে লোক খুশি তো হলোই না, কেটেকুটে বইয়ের মতো করে ঠিক করতে করতে বললেন, ঠিক বইয়ে যেমনটা আছে তেমনটাই লিখতে হবে, ওস্তাদি করা যাবেনা! লোকের কথায় হতভম্ব হয়ে গেলাম; তার ভাষ্যমতে ব্যাপারটা আমি বুঝেছি কি বুঝিনি সেটা মুখ্য বিষয় নয়, তার থেকে বড় বিষয় হলো গিয়ে হুবহু বইয়ের মতো করে আমি লিখতে পেরেছি কিনা। এই ঘটনার পর মনে হয় সেখানে যাওয়া বাদ দিয়ে দিই, কারন সেই অভিজ্ঞতায় মনটা মরে যাবার উপক্রম হয়েছিলো।( ধর্মের ব্যাপারেও একই রকম ভাবসাব দেখি মানুষের মধ্যে। নিজ থেকে ধর্ম বোঝার কোন চেষ্টাই অধিকাংশের নেই, এদেরকে অন্য কেউ ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করবে, i mean রাখালগিরি করবে এমনটাই ইচ্ছা তাদের। কেউ কেউ আছে যাদের এমন বিশ্বাস যে বিভিন্ন কিতাবে যা লেখা আছে সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করে গেলেই ধর্ম রক্ষা পাবে, জীবনটা তাদের সহজ হবে; এমনকি পরীক্ষায় full mark/জান্নাত পাওয়া নিশ্চিত হবে, যেখানে সামান্য এক চুল এদিক-ওদিক করার কোন সুযোগ নেই।)
কোনদিন ফার্স্ট সেকেন্ড না হতে চাইলেও কি করে যেনো এর মধ্যে সেকেন্ড হয়ে গেলাম। তো ক্লাশের কিছু মেয়ে এসে আমাকে জানিয়েছিলো ফার্স্ট পজিশনের মেয়ে নাকি আরও জোরেসোরে পড়াশুনা করা শুরু করেছে, যাতে করে তার প্লেস আমি নিয়ে নিতে না পারি। ওই মেয়ে বলা যায় সে সময় আমাকে হুমকি স্বরুপ treat করতে শুরু করেছে! ওইসব ব্যাপার আমাকে মোটেও টানেনা। ভালো ছাত্রী বলে অনেকে আগ বাড়িয়ে মিশতে আসলেও তাদের প্রতিও আগ্রহ জন্মে না। বরং খারাপ ছাত্রী বা মোটামুটি মানের ছাত্রী যখন ছিলাম সে সময়ে যারা মিশত তাদের সাথেই মিশে আরাম পেতাম। তো স্কুল থেকে কলেজের গণ্ডী পেরিয়ে শুরু হলো ভর্তি যুদ্ধ। সবাই মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে পড়ার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো, আমাকেও হতে হলো। মা-বাবা সহ আরও অনেকের ইচ্ছায় মেডিকেল ভর্তি কোচিং এ ভর্তি হলাম। সেই সময়টা দেখলাম আগের যা পড়া ছিলো তা দিয়ে আর সাধারণ জ্ঞানের বেলায় উপ দশ বিশ খেলে খেলে বেশ ভালো নাম্বার পাওয়া যায়। কোচিঙয়ের শিক্ষকরাও জানালেন এই রেঞ্জের মধ্যে টেস্টে নাম্বার থাকলে মেডিকেলে চান্স নিশ্চিত। তো বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আমার দিন যায়। এরই এক ফাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঘুরে আসি ভর্তি পরীক্ষার ছুতোয়। খেলার ছলে সেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও সেখানেও কয়েকটা অনুষদে প্লেস নিয়েই পাস করেছিলাম। কিন্তু মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স হলো না, এমনকি ওয়েটিং লিস্টেও ছিলাম না। আমার সমস্যা হলো গিয়ে আমি কোন সাবজেক্টে পড়তে চাই সেটাই জানতাম না। তো মেডিকেলে চান্স না পাওয়ায় আর সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ব্যার্থতায় ব্যাথিত হলাম, কিন্তু সেসব আমাকে ছুঁয়ে যায়নি অতটা গভীরভাবে। মেডিকেলের পর ঢাকা ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসে সেই দুই জায়গাতেও টিকে যাই। তিন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্যের সাথে পড়ার সুযোগ পেয়ে যেখানে আমি আনন্দিত সেই সময় মা-বাবার থেকে শুনতে পাই ক্লাশের সেই first girl আমাদের বাসায় এসেছিলো, এসে তার সাফল্যের কথা জানিয়ে গেছে। মেয়েটি বুয়েট, মেডিকেল সব জায়গায় চান্স পেয়েছে; কিন্তু মেয়েটি বুয়েটেই পড়বে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই মেয়েটি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও সেখানে চান্স পেতো, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কোন আগ্রহ নেই তাই ভর্তি ফরমই তুলে নাই। আমি মনে মনে অবাক হলাম, যে মেয়েটি কোনদিন নিজ থেকে আমার সাথে তেমন কথা বলতে আসেনি, সেই মেয়ে কিনা আমার বাসায় গিয়ে হাজির তার সাফল্য গাঁথা শোনানোর জন্য। কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর তখন আমার জানা ছিলোনা, তবে অবাক করা ব্যাপার ছিলো বটে!
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে থাকি, ওই মেয়ে তার স্কুলের সব সময়ের গ্যাং নিয়ে আমার হলে এসে হাজির, তো ওদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ঘুরালাম। মেয়েটি বুয়েটের হলে থাকে জানালো, ওর ওখানে যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে মেয়েটি বিদায় নিয়েছিলো। কিন্তু কোনদিন ওর ওখানে যাওয়ার আগ্রহ হয়নি। তো এরপর এলো ফেইসবুকের সময়, একটা একাউন্ট খুলে ফেলে বন্ধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অনেককে এড রিকুয়েস্ট পাঠাই। অনেকে যখন একসেপ্ট করে বেশ ভালো লাগে। আস্তে আস্তে অন্যদের থেকেও ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পেতে শুরু করি। দেখি ওই মেয়েও এড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে, শুধু তাই নয় সেই মেয়ের চির প্রতিদ্বন্দ্বী(rival), primary school পিরিয়ডে যে মেয়ের সাথে first position নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিলো সেই মেয়েও এড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। দুইজনকেই এড করি, আবার এই দুই মেয়েকেই একে একে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে রিমুভও করে দিই। আর কিছু না হলেও বুঝতে পারি এই মেয়ে দুই জনের কেউই আমার বন্ধু ছিলো না কখনোই। কেউ ভালো করছে বলে তার প্রতি যদি আগ্রহ জন্মে তাহলে খারাপ perform করলে পরে এরা আস্তে আস্তে লেজ গুটিয়েই পালাবে। মেয়ে দুইটিরওবা কি দোষ দিবো, পরিবার থেকে ওমন শিক্ষাই তো তারা পেয়েছে। তাদের জীবনটাই চলছে জকির উটের মতো, এর বাইরে তারা তাদের জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পেতে শিখেনি। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকাটাই তাদের জীবনের লক্ষ্য, এর অন্যথা হলে তাদের পক্ষে মৃত্যুর শামিল। এজন্য অনেক সময় সফল জীবনের নানা প্রলোভন পেয়েও সেদিকটা সযত্নে এড়িয়েই চলেছি, কারন সমাজের চোখে অসফল যারা তাদের কাছে আর যাই হোক দুধের মাছিরা ভীড় জমায় না! এখন এই সময়ে এসে মনে হয়, এইসব মানুষজনের সাইকোলজি পরিস্কার হলেও, সফল হতে চাওয়াও তো দোষের কিছু না। যারা সফল হতে চায়, সফলতার পেছনে দৌড়ায় যারা, তাদের প্রতি আমার অনীহা ছিলো বরাবরই। অন্যদের সফলতার ঘোড়দৌড়ে না নামি, তাদেরকে ঘৃণা করাও তো এক ধরণের পাগলামি। সফলতাকে সহজভাবে গ্রহণ করার সময় এসেছে, সফল হয়েও সফল জীবনের দাস না হওয়াটাই মুখ্য ব্যাপার। এটাকে এক ধরণের সংহতি বলা চলে। এখন বুঝি সমস্যাটা আমারই। ওই first girl আসলে আমাকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিচার করেছে যে মুহুর্তে সেই মুহুর্তেই সে আমাকে তার সম মর্যাদার একজন বলে স্বীকার করে নিয়েছে যেটা কোন কারনে আমার মধ্যে নেই, হয়তো আমার মধ্যে এমনি এক ধরণের চাপা অহংকার আছে এই নিয়ে যা অনেক সময় অনেক হত দরিদ্রের মাঝেও দেখা যায়। সংহতির জন্য প্রয়োজন অন্য ব্যক্তিকে প্রতিবেশী, মর্যাদায় সমান একজন সহমানব হিসেবে দেখা। সংহতির অর্থ হলো পরস্পরের প্রতি আমাদের দায়িত্ব স্বীকার করা এবং অন্যদের তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে সাহায্য করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করা । এটি কেবল একটি অনুভূতি নয়। এটিই আমাদের কর্মে উদ্বুদ্ধ করে।