এই নিজেকেই চেনার কোন শেষ নেই যেনো!

সিরিয় এক মহিলা অন্য আরও কিছু আরব মহিলাদের সাথে নিয়ে একদিন আমাকে সরাসরি ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করা শুরু করলো। ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করলো- কেনো আমি মুসলিম হয়েও হিজাব পরিনা? এই প্রশ্নটি আমি ব্যাক্তিগতভাবে নিয়ে ফেলি, রেগে যাই স্বভাবতঃ আবেগের বশে। কারন আমার যে ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা সেখানে হিজাব করার সামাজিক চাপ ছিলো। যারা হিজাব করেনা বা মাথায় ওড়না দিয়ে চুল, মুখ ঢেকেঢুকে চলেনা তারা ভালো মেয়ে নয়, তাদের চলাফেরায় আছে পুরুষদের তাদের সাথে যা খুশি করার হাতছানি। হিজাব না পড়াও এক ধরণের নগ্নতা, এতে করে পুরুষজাতির মাথা খারাপ হয়ে যা খুশি তাই করে ফেলার আশঙ্কা করা হয়! আমার আশেপাশে মানুষ মাথায় কাপড় টেনে নিয়েছে দেখেও আমি অনেক সময় মাথায় কাপড় তুলে নিইনি। কোরআন-হাদিসে হিজাব করার নির্দেশ আছে এরকম কথাও বারবার আওড়ানো হয়েছে। মেয়েরা উদ্ধতভাবে চলাফেরা করলে পৃথিবীতে প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও গজব নেমে আসে এরকম কথাও অনেক শুনেছি। হিজাব করলে মন্দ দৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এরকম নানা কথার ফুলঝুরিও কম শুনিনি। যাই হোক তো সেই প্রশ্নের জেরে আমি ওদের সাথে তর্ক জুড়ে দিই। স্বভাবতই রেগে গিয়ে আমার গলার স্বরও অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছিলো। তখন সেই আরব মহিলাগুলো অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে চুপ হয়ে যায়। এরপর ইংরেজি জানা এক আরব মেয়ে এসে আমার সাথে কথা বলা শুরু করে, ও আমাকে বলে কোরআনে এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ আছে আমি চাইলে ও আমাকে বুঝিয়ে দিবে; আমিও আমার যতটুকু জ্ঞান আছে তাই নিয়ে ওকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিই, কিছু আয়াতও উল্লেখ করি। এরপর আরেকদিন ওই মেয়েকে আমি জিজ্ঞেস করি কোরআনে কোথায় হিজাবের নির্দেশ আছে তা আমাকে দেখাতে, কিন্তু ও তা এড়িয়ে যায়; কারন হয়তো ও ততক্ষণে বুঝে গেছে আমি তলাহীন কোন কলস নই যা বুঝাবে তাতেই হ্যাঁ হ্যাঁ করে যাবো। যে আমি হিজাবের প্রশ্নে ক্ষেপে যাই সেই আমিই একদিন এক ইরাকি মহিলাকে জিজ্ঞেস করে বসি- সে তো মুসলিম তার উপর আবার আরব, সে কেনো হিজাব করেনা। আমার করা ব্যক্তিগত এই প্রশ্নে সেই মহিলা মোটেও ক্ষেপে যায়নি। সে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে হিজাব করা যার যার ব্যাক্তিগত ব্যাপার; কারো ইচ্ছে হলে হিজাব করে, ইচ্ছে না হলে করেনা। ইরাকি এমন মহিলার সাথেও মিশেছি যারা হিজাব পড়ে কিন্তু হিজাব পড়েনা বলে অন্যদেরকে মন্দ মনে করেনা মোটেও। বাংলাদেশে আমারই অনেক সহপাঠক-সহপাঠিকাকে দেখেছি যারা বেশ ধর্ম কর্ম করে, হিজাবও পরে কিন্তু যারা হিজাব পড়েনা তাদের পোশাক নিয়ে এতো আজেবাজে মন্তব্য করতে দেখেছি সেসব শুনতেও খারাপ লেগেছে। পোশাক যার যার ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার, কে খোলামেলা হয়ে চললো আর কেইবা ঢেকে ঢুকে চললো এখানে বাইরের মানুষের নাক গলানো বা মন্তব্য ছুড়ে দেয়া খুবই বাজে অভ্যাস বলেই আমার মনে হয়। দুঃখজনক হলেও মেয়েদের পোশাক কেমন হবে তা নিয়েও চলে রাজনৈতিক নোংরা খেলা। বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে কোলের শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়না শারীরিক নির্যাতন থেকে সেখানে হিজাবী, বোরকাওয়ালী এমন মেয়েও কি নৃশংসতা হতে রেহাই পেয়েছে? আফগানিস্তানের এক মহিলার থেকে জেনেছি মেয়েদের পায়ের টাখনুর একটু উপরে পায়জামা থাকলেই মোল্লারা লাঠি দিয়ে পেটানো শুরু করে। এছাড়াও তো আছে আট নয় বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়া; মেয়েদের বিদ্যালয়ে, ঘরের বাইরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত! আমাদের দেশে হিজাব যারা পড়ে, আর হিজাব যারা পড়েনা তাদের মধ্যে অনেক সময়ই এক বিরাট দ্বন্দ্ব কাজ করে। হিজাব পড়ে যেসব মহিলা তারা নন হিজাবীদের দেখে উল্টাপাল্টা অনেক কথা যেমন বলে, তেমনি হিজাবী মহিলাদেরকেও অনেক সময় বাঁকা চোখে দেখে নন-হিজাবী মহিলারা। আমি বুঝে যাই আমাদের দেশের মানুষজন চরম প্রতিক্রিয়াশীল। যে কোন বিষয়ে মতামত দেয়ার মানুষের অভাব নেই। সোশাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় বিভিন্ন ইস্যুতে মানুষজনের বাহারি মন্তব্যের বন্যা। ক্রমাগত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মতো নানা ঘটনা ঘটতেই থাকে। ছোটখাটো কত কি নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন শুরু হয়ে যায়। এতো সাধারণ ব্যাপার নিয়ে আমাদের মধ্যে যে তীব্র আবেগীয় অনুভূতির ঘটনাপ্রবাহ চলে, পৃথিবীর আর কোথাও মনে হয়না এমনটা হয়। এমন সামাজিক অবস্থায় মানুষের জন্য মুশকিল হয়ে যায় ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক নির্ধারনে। ইরাকি সে মহিলার সহজ স্বাভাবিক উত্তরে মনে পড়ে যায় আমার অতীত অভিজ্ঞতা যেখানে আমি কিনা কি তীব্র আবেগেই না (emotionally charged up) তাড়িত হয়েছিলাম আপাত নির্দোষ এক প্রশ্নে। এখন বুঝি কে আমাকে কি উদ্দেশ্যে কি প্রশ্ন করছে সেটা বিচার(asses) করেই আমি অস্থির হয়ে পড়তাম, সেজন্য আমার আচরণ হয়ে উঠতো প্রতিক্রিয়াশীল; যাকিনা আমারই স্বীমাবদ্ধ চিন্তার ফসল। এই ঘটনায় আমার মনে হতে থাকে শুধু কি এই ব্যাপার?! আরও কত শত সাধারণ ব্যাপার আছে যেখানে আমরা কত সহজেই ট্রিগারড হয়ে পড়ি। বয়সের কারনেই হোক কিংবা বর্নিল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার কারনেই হোক স্টোয়িক ফিলোসোফার Epictetus এর কথা এখন বেশ অনুধাবন করতে পারি জীবনে। “It’s not what happens to you, but how you react to it that matters.”

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121