দাবার গুটি বদলের খেলা!

জীবনে কোন ইহুদী দেখিনি, কেবল তাদের কথা শুনেছি। ইহুদী জাতি খুব খারাপ, প্যালেস্টাইন দখল নিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের উপর দীর্ঘকাল ধরে এরা নির্যাতন করে আসছে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি ইয়াসির আরাফাতকে নিউজ মিডিয়ায়, সেই প্যালেস্টাইন নেতাকেও ইসরায়েলি হানাদার বাহিনীদের কুচক্রে মেরে ফেলার বিবরণ পড়েছি খবরের কাগজে। ওদের বর্বরতার খবর অনেক পড়েছি, ওদের বর্বরতার করাল গ্রাস গর্ভবতী মা এমনকি শিশুদেরকেও ছাড়েনি। এইসব খবর দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। একদিকে নির্যাতনের খবর, জোর দখলের খবর অন্যদিকে প্রযুক্তিশিল্পের উন্নয়নে (ডেভেলপমেন্ট) অভাবনীয় অগ্রগতি। আর জ্ঞান বিজ্ঞানের শীর্ষ স্থানগুলোতে ইহুদীদের ব্যাপক পদচারণা। যত বড় বড় টেকি কোম্পানি আছে, যত বড় বড় ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান আছে সবগুলোতে এদের একক আধিপত্য। দেখা গেলো একদিকে সবাই এদের কুকর্মের জন্য এদেরকে ঘৃণা করে যাচ্ছে, অন্যদিকে এদেরকেই সবাই অনুসরণ করছে। যত বড় বড় ব্যাক্তিত্ব প্রায় সবই ইহুদী বংশোদ্ভূত। আমাদের দেশের ওয়াজ মাহফিলে ইহুদী ও খ্রিস্টান দুই ধর্মাম্বলীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ালেও ইহুদীদের প্রতি ঘৃণা প্রবলভাবে অনুভব করা যায়। মনের অজান্তেই আমার মধ্যেও ইহুদীদের প্রতি ঘৃণা বেশ জোরালোভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সেটা আমিও জানতাম না। যে ন্যারেটিভের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি সেখানে এই ব্যাপারটা যাচাই করার কোন সুযোগ ছিলোনা। অন্য আরও অনেক ন্যারেটিভের মতোই এই ব্যাপারটাও কেনো জানি বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে চাইনি। একটা সময়ে এসে ওদের নিয়ে গতানুগতিক চিন্তার বিপরীতে চিন্তা করতে চেয়েছি অনেকটা মনের উপর জোর খাটিয়েই। খুঁজতে লাগলাম ইহুদীদের কি কি ভালো দিক আছে। বিশ্বে ওদের অবদান কি? আমিও তো ইহুদী ঘরে জন্ম নিতে পারতাম! ওদের জায়গায় থাকলে আমিও কি ওমন পাশবিক হতাম? জার্মানিতে এসে একটা খোলা বাজার থেকে আম কিনে দেখলাম সেটা ইস্রায়েলী। মেজদোল খেজুর কেনার সময় দেখি ইসরায়েলি পণ্য- মনে মনে হাসি যে প্যালেস্টাইন খেজুর ওদের নামে বিক্রি করে, শ্লা বাটপার কোথাকার! কিন্তু আমি ন্যারেটিভ পরিবর্তন করতে চেয়েছি; তাই অনেকটা জোর করেই ইস্রায়েলী আমের প্রশংসা করলাম ও তা মানুষের সাথে শেয়ার করলাম যে ইস্রায়েলী আম অনেক মজা। সেই আমের একটা ছবিও তুলে রেখেছিলাম। যাই হোক কৃষিক্ষেত্রে ওদের অবদান কি? জানতে পারলাম টমেটো নিয়ে ওরা ব্যাপক গবেষণা চালাচ্ছে। আলবার্ট আইনস্টাইন বলতে সবাই যেখানে পাগল সেই ব্যাক্তিই ইহুদী, যার কিনা আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সুসম্পর্ক ছিলো। ব্যাংকিং সিস্টেমও ইহুদীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলো। টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর প্রায় সবগুলাই ইহুদীদের। মনে পড়ে যায় যতই দুনিয়াবি অর্জন থাকুক, ওরা কোনদিন বেহেশতে যেতে পারবেনা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি সবখানে যেমন এদের অবদান আছে, তেমনি ধ্বংসাত্নক যত উদ্ভাবন ও কর্মকান্ডের সাথেও এরা জড়িত, এর মধ্যে সবচাইতে রোমহর্ষক লেগেছে যখন bio-weapon এর বিষয়টি জানতে পেরেছি। এ যেনো আলো-আধারির নিত্য খেলার মতোই ইহুদীদের মধ্যেও ভালো-মন্দ এই দুই রুপই যেনো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এরপর আস্তে আস্তে বুঝে যাই কেনো মুসলিমরা এই দৌড়ে বলির পাঠা। এক সময় ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মাম্বলীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছিলো, যা আর কিছুই না ক্ষমতার লড়াই(power struggle) মাত্র। যদিও আব্রাহামীয় ধর্ম দুটোই তারপরও লোকজন দুই ভাগে বিভক্ত দুই ধর্ম দিয়ে, যা আসলে চিরকালের মতোই সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এই দুই দলের লড়াই। ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শেষ করার জন্যই এসেছিলো ইসলাম ধর্ম। শান্তির ধর্ম ইসলাম এই দুই ধর্মের লোকদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই আবির্ভুত হয়েছিলো, কিন্তু যা হয় আর কি, আমে দুধে মিশে গিয়ে মুসলিমরা হয়ে গেলো আমের আঠি। ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চাদের মতো মুসলিমদেরকে শুত্রু বানিয়ে ইহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মাম্বলী হয়ে গেলো পরস্পরের বন্ধু। ইহুদীদের অনেক বাছ-বিচার, খ্রিস্টানদের সেখানে কোনই বাছ-বিচার নেই। ইহুদীদের মতো মুসলিমদেরও অনেক বাছ-বিচার কিন্তু এতে আবার মুসলিমরা নিন্দিত, ইসলাম ধর্ম অনুসরণের জন্য তাদেরকে মৌলবাদী আখ্যা দেয়া হয়। সারা বিশ্বে islamophobia যেভাবে ছড়িয়েছিলো তাতে করে মুসলিম হয়েও আমি মুসলিমদের ভয় করতে শুরু করেছিলাম কবে থেকে বুঝতেই পারিনি। হিজাবি মহিলা দেখলেই ধরে নিয়েছি তারা গোড়া হিন্দুর মতোই যারা জাত যাওয়ার ভয়ে সব সময় ভীত-স্বন্ত্রস্ত। দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক দেখলেই আতঙ্ক জন্মেছে এই না এই লোক হিজাব পরিধান করার ফতোয়া দেয়। আত্নঘাতি বোমা হামলা ছাড়াও মুক্তমনে লিখালিখির কারণেও এরা কুপিয়ে মেরে ফেলতে পারে। যাই হোক ইহুদী দেখিনি সারা জীবন কিন্তু তাদের প্রতি আমার যেখানে এতো রাগ, জার্মানিতে এসে অনেক আরব এমনকি প্যালেস্টাইনকেও দেখলাম তাদের প্রতি বেশ বন্ধুসুলভ। ওরা যদি বন্ধুসুলভ হয় তাহলে আমার সমস্যা কি? আমার সাথে তো ওদের সরাসরি কোন দ্বন্দ্ব নেই! এক ইহুদী মহিলার সাথে পরিচয়ের পর ইহুদীদের ভেতরের যে বিদ্বষভাব ছিলো তা আর নেই; তবে মনে মনে এও ভাবি আজ ও আমাকে এতো আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, যদি ওর স্বার্থের বিরুদ্ধে যাই তাহলে সেরকম নির্মম হতেও কি ও ছাড়বে। সরীসৃপীয় জগতে এটাই তো বাস্তবতা! আর ওরা যে প্যালেস্টাইনদের প্রতি অন্যায় করছে তার সাজাও ওরা ঠিকই ভোগ করবে, সে ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ার কিছু আসে যায় না। তবে হ্যাঁ যখন ইতিহাস পড়ি ইহুদীদের উপর ফিরাউনরা এক সময় কত অন্যায় করেছিলো, অত্যাচার চালিয়েছিলো, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও যেখানে তাদেরকে দলে দলে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছিলো নির্বিচারে; সেই তারাই আজকে প্যালেস্টাইন মুসলিমদের প্রতি নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে। স্বয়ং নেতা নিয়াহু বলেছেন এমনও হতে পারে ধ্বংসস্তুপে হয়তো কেউ একজন বেড়ে উঠছে যে কিনা তার বিনাশ করবে। এক্ষেত্রে সনাতন ধর্মের কর্মফল নীতি আমার মনে বেশ জোরালো প্রভাব ফেলে যায়, সত্যিই কর্মফল বটে, বিগত সময়ের দাস ইহুদীরা আজকের ফিরাউন, তার মানে কি ভবিষ্যতে মুসলিমরাও ফিরাউনের জায়গা দখলের সম্ভাবনা রাখে? এ যেনো কেবল দাবার গুটি বদলের খেলা!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121