ঝড়ে পড়া এক বুড়ির আত্নকথন!

প্রচণ্ড এক ঝড়ে বৃদ্ধা তার সন্তান হারিয়েছেন। তার প্রথম সন্তান, যাকে ঘিরে কত শত স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। আজও সেই স্মৃতি মনে হলে তিনি পীড়িত অসহায় এক মা হয়ে যান যে নিজে ঝড় থেকে বেঁচে ফিরলেও সন্তানকে হারিয়েছিলেন চিরতরে। আজ তাঁর চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা জমে আছে। যে জীবন সন্তান হারানোর ব্যাথায় দুঃসহ হয়ে উঠেছিলো এক সময়, বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সে জীবনকে ঘিরেই কত আয়োজন। কতবার সে ভেবেছে তার বদলে তার আদরের সন্তান বেঁচে থাকলে কি হতো?! জীবন বড়ই নির্মম, কারোর ইচ্ছেতে কি আর জীবন চলে? সবই সৃষ্টিকর্তার খেয়াল খুশি। এই ছোট্ট জীবনে কত সুখ এসে ধরা দিয়েছে দুঃখের পাশাপাশি। কিন্তু কোনও সুখ কি আর তেমনভাবে ছুঁয়ে গিয়েছে? সুখের মুহূর্ত এলেই মনের কোণে আতঙ্ক, এই বুঝি কোন বন্যায় সব ভেসে যায়, কিংবা কোন ঝড় এসে সব লন্ডভণ্ড করে দেয়! এই করে করে সুখটাও তার আর সেভাবে উপভোগ করা হয়ে উঠেনি। অন্যের সুখ দেখেই সে স্বস্তি খুঁজে পেতে চেয়েছে জীবনের বাকীটা সময়, ক্ষণিকের সুখ তাকে আর আলোড়িত করতে পারেনি তেমনভাবে। তীব্র সুখে কিংবা দুঃখে সেই হারানো ছেলের মুখটাই ভেসে ওঠে তার মনে। জীবনের ধাপে ধাপে কতজনকেই তো হারাতে হয়েছে, সব হারানোর বেদনা ছাপিয়ে সেই ছেলে হারানোর বেদনাটাই তীব্র হয়ে ধরা দেয় তার কাছে। পাগল মনটাকে নিয়ে সে কীইবা করতে পারে,নানা ছুতোয় মন ব্যাস্ত হয়ে থাকে। আচ্ছা ছেলেটা আজ বেঁচে থাকলে ওর ঘরে ছেলে-পুলে হতো না? ছেলেটা বেঁচে থাকলে তার এই বৃদ্ধা মাকে কখনোই অবহেলা করতো না! আহা কত সুন্দর, কত ভালোই ছিলো সে। ত্রিকুলে ওর মতো দেখতে কি আর কেউ হয়েছে। হারানো ছেলের ভাবনায় ডুবে থাকতে ভীষণ ভালো লাগে তার, আশেপাশের সবকিছুতে তার মন বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে। সংসারের দায় কোনমতে সেরেই আশেপাশের মহিলাদের সাথে চা-পান আর মুড়ি মুড়কি নিয়ে আসর জমানো তার রোজকার অভ্যাস। আর কিছু না হলেও পান ও চা তার লাগবেই, এই দুইই যেনো তার জীবনের খোরাক। আর যেটা তার প্রয়োজন তাহলো নিত্য মানুষের সঙ্গ, দুই-চারদিন আড্ডা ছাড়া জীবনে তার হাঁসফাঁস লাগে। বৃদ্ধ বয়সে ছেলে-মেয়েরা তাকে নিয়ে বিপদে পড়ে যায়। কোত্থেকে এতোসবকিছুর জোগান দিবে তারা, বয়স হয়ে গেছে কিন্তু চাহিদা একটুকুও কমেনি। পান,তামাক, চা, ভালো-মন্দ খাবার তো তার লাগেই, সেই সাথে এত মানুষের জোগান কোত্থেকে আসে! সেই সাথে ফুট-ফরমায়েশের তো কোন শেষ নেই! এই যুগে এসে এতোসব আবদার মেটানো কি সহজ কথা! বৃদ্ধা অতকিছু বুঝেনা, তার খালি মনে হয় মানুষের কি কোন প্রয়োজন থাকতে নেই! সবার কত কত চাহিদা, তার চাহিদা তো মাত্র হাতেগোনা কয়েকটা! সামান্য এইসবের জোগান দিতেই ছেলে-মেয়েরা হিমশিম খায়! তাদের এতো ব্যাস্ততা কিসে? দুদণ্ড বসে ওরাও তো জিরিয়ে নিতে পারে একটু, আগেকার যুগে কি আর এতো সুবিধা ছিলো! তারপরও তো কোন দায়িত্বে অবহেলা সে করেনি! মনে পড়ে যায় তার হারিয়ে যাওয়া ছেলের কথা, বেঁচে থাকলে আজ তাকে অনেক যত্নে রাখতো; কোনরকম অনাদর হতে দিতো না! না সে মানে যে ছেলে-মেয়েরা সবাই তার জন্য করে, কিন্তু সে জানে সবার কাছেই সে যেন একটা বড় বোঝা। সেকি আর তার ইচ্ছেতে বেঁচে আছে, সেই কবেই তো মরে যেতে পারতো। মাঝেমধ্যে তার মনে হয় মরেই গেলেই ভালো ছিলো, শুধু শুধু বেঁচে থেকে কি লাভটা হয়েছে কার?! মরে গেলে আজ আর কারো ঘাড়ের বোঝা হতে হতো না তার! সে ঝড়ের সময় ছেলের সাথে মরে গেলেই সব ল্যাঠা চুকে যেতো! নাতি-নাতনিদের দিকে যখন চোখ যায়, সে সময় বুড়ির মনটা আবার জুড়িয়ে যায়! সে যদি আজ বেঁচে না থাকতো তাহলে এতো সুন্দর সুন্দর মুখগুলো কি আর দেখা হতো! না চাইতেই কি ভীষণ মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে গেছে বুড়ি। এতো এতো প্রিয় মুখগুলো ছেড়ে কোথাও যেতেও আর ইচ্ছে করেনা। ওদের জন্যই তো বেঁচে থাকার আনন্দ, ওদের দেখেই না বুড়ির নয়ন শীতল হয়! নাহলে কি ঠ্যাকা তার পোড়ার এই সংসারে পড়ে থেকে! ঝিনুকের বুকে যেমন মুক্তো লুকিয়ে থাকে, তার জীবনে এরাই তো সেই লুকিয়ে থাকা মুক্তো। এক একটা মুক্তা যতনে বুনে সে গলায় হার বানিয়ে পরে; এই যেনো তার বিজয় মালা! বুড়ি খেয়াল করে কি অদ্ভুত বৈপরীত্য তার মাঝে খেলে যায়। যে সারাটা জীবন সংসারের সাথে জড়িয়ে থেকেছে, তার মধ্যেই কিনা সংসারের প্রতি বৈরাগ্য! হয়তো একেই বলে জীবন! ভালো যে সে সংসারকে সেভাবে আঁকড়ে ধরতে পারেনি কোনদিন! সে তো সব সময় প্রস্তুত ছিলো সংসার ছেড়ে চলে যেতে, আর সেই কিনা কত বড় সংসার পেতে বসে আছে!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 150