আমাদের নিজেদের শত্রু আসলে আমরা নিজেরাই!

চীনের এক কৃষক পাহাড়ের পাদদেশে কাজ করছিলো। কাজ করার সময় সে এক অদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করলো। পাহাড় যেমন ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো ঠিক তেমনই আছে, কিন্তু সময়ের ভিন্নতার সাথে সাথে সেই পাহাড়ের এক পাশ আলোকিত হয়, অন্যপাশ হয়ে পড়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই ব্যাপারটা সে প্রায় প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করে, এইভাবে দিন যায় মাস ঘুরে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই পাহাড়ের উপর আলো-আঁধারের বদল ঘটতে থাকে চক্রাকারে। এই ব্যাপারটাকেই চীনে পরিচিতি পায় yin & yang হিসেবে। yin&yang যেমন পাহাড়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তেমনি মানুষের বেলাতেও। মানুষের মাঝে আলো-আঁধারের খেলা ক্রমাগত চলতেই থাকে। তাই যে মানুষটির মাঝে আমরা আলো খুঁজে পাই, সে মানুষটাই হয়তো অন্য কারো উপর তার বিরাট ছায়া(shadow cast) ফেলে রেখেছে। আজ যে মানুষটাকে আমরা দেবতা জ্ঞানে পুজো করি, সেই মানুষটাই এমন কোন কাজ করতে পারে বা এমন কিছুতে জড়িয়ে পড়তে পারে যে তাকে আমরা অসুর জ্ঞান করে তার বিনাশ কামনা করতে পারি। এই যে মানুষের মধ্যে দেবতা আর অসুরীয় রূপ সেটা তো আমাদের সব মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। এই বোধ যার হয়, যে মানুষ তার নিজের মধ্যে আলো-আঁধার উভয়কেই ধারণ করে; আলোর সাথে সাথে আঁধারকেও স্বীকার করে যে মানুষ সে খুব কমই অন্যের পিছনে লেগে থাকে। সে সব সময় তার মধ্যকার আঁধার ও তার প্রভাব নিয়ে সচেতন হয়ে পড়ে। একইসাথে ভালো দিকটুকু নিয়েও সে গর্বিত হতে পারেনা, কারন সে জানে তার আপাত ভালো দিকটাও স্থায়ী কোনকিছুনা। যার মধ্যে আলো-আঁধারের (integration) সমন্বয় হয়েছে সে জানে, তার প্রতিটি পদক্ষেপে সে যেমন আলো বয়ে নিয়ে চলে একই সাথে বয়ে নিয়ে চলে আঁধারও। প্রাথমিক দ্বন্দ্ব থাকলেও আলো-আঁধারির ব্যাপারটা সে এক সময় সহজভাবেই মেনে নিতে পারে তাই। মানব জন্মের ট্রাজেডিই এখানে যে, সে আলো-আঁধারের এক জগতে বাঁধা পড়ে যায়। একদিকে তার পার্থিব শরীর, অন্যদিকে তার স্বর্গীয় আত্না। সে যত বিশুদ্ধ হতে চাইবে, তার মধ্যকার পাশবীয় শক্তি তত শক্তিশালী হয়ে প্রকাশ হয়ে পড়বে। সে যখন নিজের মধ্যকার আঁধারকে অস্বীকার করে তখন সেই আঁধার সে খুঁজে পায় অন্যের মাঝে। এজন্য আমরা দেখি বড় বড় যেসব ব্যাক্তিত্ব যারা তাদের কাজের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে পরিচিতি ও সম্মান অর্জন করেছে তাদের নিয়ে সব সময় মানুষকে দুই দলে ভাগ হয়ে যেতে। একদল তাদের কুৎস্যা ছড়ায়, অন্যদল তাদের গুণগান গায়। এই যে দলাদলি এটা আর কিছু না, কেউ যখন আলো খুঁজে পাচ্ছে ঠিক একই সময় অন্য কেউ আঁধার দেখতে পায়। পারস্য কবি রুমির ভাষায় “The beauty you see in me is a reflection of you”. এই ছোট্ট কথাটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। কাঁচ কিংবা হীরের মধ্যে পার্থক্যটা তো আগে বুঝতে হবে! যে হীরে চেনে না সে তো কাঁচকেই হীরে ভেবে ভুল করবে! কেউ যদি কারও মধ্যে ভালো খুঁজে পায় তাহলে সে ভালোটা চেনে বলেই ভালোকে ভালো বলতে পারে। কেউ যখন আমাদের মধ্যকার সৌন্দর্যটুকু খুঁজে পায় তাহলে সে সেই সৌন্দর্য নিজের মধ্যে ধারণ করে বলেই তা চিনতে পারে। যে সেই সৌন্দর্যটুকু ধারণ করেনা সে তো কখনোই সেই সৌন্দর্য দেখতে পাবেনা, সে বরং তার ভেতরকার কদাকার দিকটি অন্যের উপর প্রক্ষেপণ করবে। আমাদের দেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুহাম্মদ ইউনুস, হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফা, হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, অভিজিৎ রায় এদের নিয়ে আমরা যেসব আলোচনা বা চর্চা দেখি তাতেই বেড়িয়ে আসে বাঙালীর মধ্যকার চির দ্বন্দ্বময় রূপ। কেউ এদেরকে দেবতাজ্ঞানে পুজো দেয়, কেউ এদের নিয়ে কুৎস্যা ছড়ায় অসুর হিসেবে তুলে ধরে। মানুষের মধ্যে এই যে আচরণ এইটা হচ্ছে তাদের নিজেদের ভেতরকার আলো-আধারের প্রক্ষেপণ(projection)। কেউ যখন কেবল ভালো খুঁজে পায়, অন্য একজন কেবল মন্দ দিকগুলোই খুঁজে পায়। আজকে দেশের ক্রিকেট দল ভালো করলো, সাথে সাথে এক দল ক্রিকেট দলের বন্দনা শুরু করলো; খারাপ করলেই ওদের নিয়ে কুৎস্যা রটানো, বিদ্বেষ ছড়ানো শুরু হয়। অনেক সময় ক্রিকেটারদের বাড়িঘরে হামলা পর্যন্ত করে বসে। ভারতে তো অবস্থা আরও খারাপ একদিন দেখি শচীন টেন্ডুলকারকে নিয়ে পুজো দিচ্ছে; এরপরেই আবার দেখি তার উপর জনগণ চ্যাতা, তার ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গুড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে!

জীবনের যাত্রাপথে অনেক রকমের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, সে দিক দিয়ে ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা বেশ সমৃদ্ধই বলা চলে। কত রকমের মানুষের সাথে মিশেছি, কত রকমের মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। অনেক সময় এমন হয়েছে সম্পূর্ন অপিরিচিত মানুষ তার ব্যাক্তিগত কথা উগড়ে দিয়েছে আপন মনে করে, যদিও সে জানে ভিড়ের বাসে হুট করে দেখা; কোনদিন আবার দেখাও হবেনা। কেনো সে তার মনের কথা শেয়ার করেছে? মনে মনে এই ভেবে অবাক হই! তখন আবার বুঝে নেই কিছু কথা সবাইকে বলা যায় না। আবার সবাই সব সময় ভালো শ্রোতাও পায় না, শ্রোতা পেলেও ভরসা করতে পারেনা যে সেইসব দূর্বলতার কথা না আবার তারই বিরুদ্ধে ব্যাবহৃত হয়। তাই হুটহাট চেনে না জানেনা এমন কাউকে সেইসব কথা উগড়ে দিয়ে খানিকটা হালকা হওয়া আর কি! আমরা জানি শেখ মুজিব যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশ নিয়ে হিমসিম খেয়েছিলো, তার কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেও ভুল ছিলো; কিন্তু ক্রান্তিকালে দেশের যে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে সারাজীবন বাঙালীর অধিকার আদায়ে দেশের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে জীবনপাত করেছে তার অবদানকে আমরা অনেকে তাচ্ছিল্যের সাথে স্মরণ করি। কেনো করি? আর কিছু না তাকে ছোট করতেই। একটি দেশে সেনাদের কাজ কি? সেনাদের কাজ বাহ্যিক আক্রমণ থেকে দেশের সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষায় কাজ করে যাওয়া। দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার কোন এখতিয়ার নেই। কেউ যদি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে তাহলে সেটা অবৈধ। পাকিস্তানে এটা হয়েছিলো, যেখানে আজ পর্যন্ত সামরিক শাসনই বহাল আছে; রাজনৈতিক দলগুলো সেখানে সুবিধা করতে পারেনা(বেনজীর ভুট্টো হত্যাকাণ্ড, ইমরান খান কে জেলবন্দী) কারন সেনাদের হাতে সর্বময় ক্ষমতা; আর সেই দেশে সেনাদের শক্তিশালী করেছে আমেরিকা তার নিজেরই স্বার্থে। সেই পাকিস্তানের পথ ধরে বাংলাদেশেও দেশের সর্বময় ক্ষমতা খন্দকার মোশতাক আহমেদের হাত বদলে চলে যায় জিয়াউর রহমানের হাতে; বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের স্বীকারোক্তি যে মাস্টারপ্ল্যান হয়েছিলো একাত্তরেই, ভারতের মাটিতে। জিয়াউর রহমান ছিলো ক্ষমতালোভী, সেনা অফিসারদের মধ্যে যা ছিলো সর্বজনবিদিত। শুরু থেকেই স্বাধীন দেশের নায়ক হওয়ার তীব্র বাসনা ছিলো জিয়ার ভেতর; কাজেই সে যে খুব clean character সে কথাটি বৈধ নয়। তাই আমরা দেখি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শেখ মুঝিবের অবদানকে ছোট করে তুলে ধরার চেষ্টা করা, বিপরীতে জিয়ার মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে বড় করে তুলে ধরে সেসব ফলাও করে প্রচার করা। আমরা দেখেছি খালেদার আমলে মুজিবের মৃত্যুবার্ষিকিতে কেইক কেটে খালেদার জন্মদিন উদযাপনের ঘটনা, মুজবকে জাতির জনক হিসেবে অস্বীকার করে স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মগজ ধোলাই করার চেষ্টা, বিপরীতে ধর্মীয় ব্যাক্তিত্ব হযরত হিব্রাহীমকে জাতির পিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধকে অস্বীকার করে ভারত বিদ্বেষ ছড়ানো, শেখ মুজিব সাধারণের মতো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি বলে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার পুরো অবদানকে নাকচ করে দেয়া। বাবা মুজিবের মতোই হাসিনার পরিণতি হবে এই প্রকাশ্যে বলে হুমকি দেয়া। এই যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির আবির্ভাব এই পুরো ব্যাপারটার পেছনে রয়েছে এক কদাকার অধ্যায়। এই সত্য সবাই দেখতে পারেনা, পারার ক্ষমতাও নেই। তাই কিছু কিছু বাংলাদেশীকে দেখা যায় মুজিব ও মুজিব পরিবারের বিরুদ্ধে কুৎস্যা রটায়; অনেক সময় বুঝে, বেশীরভাগ সময় না বুঝে। ভালোকে ভালো, সত্যকে সত্য, আর সুন্দরকে সুন্দর হিসেবে সবাই যদি চিনতে পারতো তাহলে আলো-আধারের দুনিয়ার সব খেল খতম হয়ে যেতো হয়তো।

আরেকটা উদাহরণ দেই তাহলো- হুমায়ুন আহমেদ লেখক ও নির্মাতা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো তার জীবদ্দশাতেই; যে সৌভাগ্য সবার হয়না। মানুষ হিসেবে তার ভুল ত্রুটি থাকতে পারে, আর ভুল ত্রুটির ঊর্দ্ধে কেউ নেই। অনেকে লেখক হিসেবে তার লিখার মান বিচার করে তাকে নিম্নমানের লেখকের সারিতেই জায়গা দেয়। কেউ কেউ তার লিখা অখাদ্য বলে মন্তব্য করে। কিন্তু আমরা জানি তার লিখা সহজপচ্য, সহজপাচ্য বলেই যে তার লিখার মান একেবারে খারাপ তাও না। যে দেশের মানুষ পাঠ্য বইয়ের বাইরে বই পড়ায় আগ্রহী নয়, সেই দেশের বিপুল মানুষ তার বই পড়েছে। কোন একটি সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ঘরানার লিখা থাকবে, একেক পাঠক মহলে একেকজন সমাদৃত হবে সেটাই স্বাভাবিক। সব সময় জ্ঞানগর্ভ, গুরুগম্ভীর বইই পড়বে সবাই এটা বাস্তবসম্মত নয়। কেউ যদি নিতান্ত বিনোদনের জন্য হুমায়ুন আহমেদের বই পড়ে, তাতে বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকের মধ্যে ঘোরতর আপত্তি। আমি নিজেও হুমায়ুন আহমেদের বই পড়ে, টিভি সিরিয়াল দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়েছি। বই পড়ে ওমন নির্মল লাভ আনন্দ লাভ করা যায় তা হুমায়ুন আহমেদের বই না পড়লে আমার জানা হতো না। হুমায়ুন আহমেদের এই যে লেখনী গুণ তা সব লেখকের মধ্যে নেই, ছিলোনা। উদাহরণস্বরূপঃ ইমদাদুল মিলনের ২/৩ টা বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। কিন্তু সেগুলো না ছিলো চিন্তা উদ্রেগকারী, না ছিলো বিনোদনমূলক; কাজেই তার লিখা বই বেশী পড়া হয়নি। টুকটাক হাজিবাজি অনেক বাংলাদেশী লেখকের বই পড়েছি হুমায়ুন আহমেদের সমসাময়িককালে, কিন্তু সেগুলো ধরে রাখার মতো লেখনী ছিলোনা মোটেও। যাই হোক এই হুমায়ুন আহমেদ নিয়েও বিতর্ক চলে, মানুষ দুই দলে ভাগ হয়ে গিয়ে গলাবাজি করে। ইদানীং দেখছি ইউনুসকে নিয়েও একই ব্যাপার। এই যে দলাদলি, গলাবাজি এইসবে কার বা কাদের ক্ষতি হচ্ছে?! ক্ষতি হচ্ছে কিন্তু আমাদেরই। একদল দেখি ইউনুসের নোবেল পুরস্কার বাতিল হয়ে গেলে খুশি হয়, আরেকদল চায় তার সম্মান রক্ষা পাক। যে জাতি নিজেদেরকে নিয়ে নিজেরাই কামড়াকামড়ি করে, তাদের আর বাইরের শত্রুর প্রয়োজন পড়েনা, অধঃপতনে যাওয়ার জন্য তারা নিজেরাই যথেষ্ট। আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তান এইগুলো তো সব কাল্পনিক শত্রু, আমাদের নিজেদের শত্রু আসলে আমরা নিজেরাই!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 150