বটগাছের গল্প

এক দেশে ছিলো এক বটগাছ। বটগাছটা জানে না কোথা থেকে সে সেখানে এসেছে। বয়সে ছোট বলে তার মনে অনেক প্রশ্ন আসে যেগুলোর উত্তর তার জানা নেই। অবাক হয়ে বটগাছটা তার চারপাশের সবকিছু খেয়াল করে। সে দেখে তারই মতো আরো অনেক গাছপালা, লতা-গুল্ম থাকলেও ওরা ঠিক যেনো তার মতো না! তাই অন্যসব গাছ-লতা-গুল্মের সাথে মিশলেও কারো সাথে ওর যেনো ঠিক মেলে না! বটগাছটা আকাশ ও নদী দেখে, দিন ও রাতের পালাবদল দেখে। ওর সবচেয়ে ভালো লাগে রাতের আকাশে অনেক তারা জ্বলে ওঠা দেখতে। প্রথমবার যখন বৃষ্টির পর আকাশে সাত রঙয়ের রংধনু দেখেছিলো, ওর মনে হয়েছিলো কি অবিশ্বাস্য সুন্দর হতে পারে সবকিছু! এইসব দেখে দেখে বটগাছের সময় কাটে, নাহলে কীইবা করার আছে তার। এক ঠায় দাড়িয়ে থাকা ছাড়া কি আর ও করতে পারে! মাঝে মাঝে যখন হাঁপিয়ে ওঠে একটানা এসব দেখে দেখে , তখন ও চোখ বন্ধ করে একটু শ্বাস নিয়ে লম্বা একটা শ্বাস ছাড়ে; এতেই শরীরটা ওর বেশ প্রশান্তিতে ভরে যায়। বটগাছটা খেয়াল করে ওর চারপাশের কত গাছ আছে সেগুলোতে কত সুন্দর সুন্দর নানা রঙয়ের ফুল ফোটে, কত গাছ আছে ফল দেয়। সেইসব ফুলে মৌমাছিরা উড়ে আসে, মধু সংগ্রহ করে আবার চলে যায়। ফল খেতে কত পশু-পাখি আসে, তারাও গাছ থেকে ফল খেয়ে কিংবা গাছের নীচ থেকে ফল কুড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। বটগাছটা কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছে দেখার জন্য যে; ওর থেকে কি ফুল ফোটে, কিংবা ফল ধরে। কত সময় পার হয়েছে বলতে না পারলেও সেই সময়ের মধ্যে সে অনেককিছু দেখে ফেলেছে। ও দেখেছে যেসব গাছে ফুল, ফল কিছু ধরেনা সেগুলো সব কেটে নিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে মানুষ। একদিন ও শুনতে পেলো কে যেনো বলছে আরও বেড়ে ওঠার আগেই বটগাছটাকে কেটে ফেলা দরকার। বটগাছ নাকি অনেক জায়গা নিয়ে নেয়, অনেক ঘন ছায়ার পরিবেশ তৈরি করে, আর সেই ছায়ায় নাকি সব দুষ্ট প্রাণীরা জড়ো হয়। বটগাছের মনটা ভয়ে একটু কেঁপে ওঠে। ওর তো কিছু জানাই হলো না- ওর পরিচয় কি, কোথেকেই বা এসেছে ও; এর আগেই ওকে কেটে ফেলবে! ভয় আসলেও বটগাছটার মনে আশাও জেগে থাকে। শেষ পর্যন্ত কেউ আর কাটতে আসেনি তাকে। তবে একবার এক প্রকাণ্ড ঝড়ের পর একদিকে হেলে পড়েছিলো সে। সেই হেলানো অবস্থা থেকে উঠে আসতে সময় লেগেছিলো তার, যদিও পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সে আর। সে সময়গুলোতে অনেকবার তার মনে হয়েছে, সেইসব ঝড়ের দিনগুলোতে কেউ যদি তার পাশে এসে দাড়াতো! এভাবেই নানা ঝড়-ঝাপটা সামলে ধীরে ধীরে বড় হয়ে বটগাছটা সত্যি একদিন বিশাল আকার ধারণ করে, আর তারই নিচে প্রকাণ্ড ছায়া পড়ে থাকে। সেই ছায়ায় কত প্রাণীরা আশ্রয় নেয়, দূর থেকে হেটে আসা ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম নেয়। কত পাখি, কীটপতঙ্গ, সাপ ওরই গায়ে বাসা বানিয়েছে। বটগাছটার বেশ লাগে যদিও কত শত ঝড়-ঝাপটা সামাল দিতে হয়েছে তাকে জীবনভর। ওর মনে হতে থাকে সেইসব ঝড়-ঝাপটার মুখোমুখি হতে মোটেও ভালো লাগেনি তার; তবুও সেইসব অভিজ্ঞতাই আজকের অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে তাকে, তাও সে উপলব্ধি করে। আর এজন্য মনে মনে সে সেইসব দিনগুলোর কথা মনে করে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে। বটগাছটা দেখে ওরই ডালের ফল খেতে আসে নানা রকমের পাখি, কিছু পাখি আবার সেই ফল ঠোটে করে নিয়ে উড়ে চলে যায়। কোথা থেকে কিভাবে সে সেখানে এসেছে সেসব না জানলেও বটগাছটা বুঝে যায় বিশাল এক সৃষ্টির অংশ সে। যদিও সে সামান্য একটা বটগাছ মাত্র, তবুও কিভাবে যেনো সবার সাথে এক অদৃশ্য সুতোয় অদ্ভুত সুন্দরভাবে গাঁথা। পাখিরা এসে বটগাছের কানে কানে গান গেয়ে যায় যখন, মনটা ওর খুশিতে ভরে ওঠে। সবাই এসে ওর কাছে তাদের মনের সব সুখ-দুঃখের কথা বলে যায়, আর বটগাছটাও সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে। অনেকদিনের অভিজ্ঞতায় বটগাছটা অন্তত এই বুঝেছে, আসলে বেশী কিছু করতে হয়না। এই যে এক ঠায় ও স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে সবার মাঝখানে তাতেই সবার অস্থিরতা কেটে যায়। যার যার সমস্যার সমাধান আসলে তারাই বের করে নেয়। হাটতে, দৌড়াতে, সাঁতরাতে কিংবা উড়তেও পারেনা সে; তবুও কোনকিছুই তার জীবন উপভোগের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তার উপলব্ধিতে পরিস্কারভাবে ধরা পড়ে- সুখী হতে খুব বেশী কিছু লাগে না! সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নিয়েই আজ ও নিজের বিশাল অস্তিত্বকে উপভোগ করে।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121