স্বপ্ন দেখার গল্প (ছোটদের গল্প)

এক শহরে এক মুরগি ছিলো। সেই শহরের এক হ্যাচারিতে আরও অনেক মুরগির বাচ্চার সাথেই ও জন্মেছে। জন্মের পর থেকে ওইসব মুরগির বাচ্চার সাথেই বড় হয়ে উঠেছে সে। ওর মনে একটাই প্রশ্ন খালি ঘুরতো যে এতগুলো মুরগির বাচ্চার সাথে ও কোথা থেকে – কি করে এলো? ও জানেও না ওর মতো অন্যদের মনেও একই প্রশ্ন ঘুরে কিনা! তবে ওর বসে বসে উলট-পালট অনেককিছু নিয়ে কল্পনা করতে ভালো লাগে। অন্য মুরগির বাচ্চাগুলো এই নিয়ে সারাক্ষণ মুখ টিপে হাসে। একজন তো বলেই বসলো সে কি অত চিন্তা করে সারাদিন, এভাবে চিন্তা করতে করতে তো ও পাগলই হয়ে যাবে। অনেকে মনে করে ও হয়তো কারো প্রেমে পড়েছে, তাই ওমন ভাবনায় ডুবে থাকে! ওদের সাথে সেই মুরগির বাচ্চাও না হেসে পারেনা। মুরগির বাচ্চার মনে হতে থাকে ওর মধ্যে আসলে একটু অস্বাভাবিকতা আছে; নাহলে অন্যদের মতো সারাক্ষণ খুনসুটি ও গাল-গল্পে মেতে থাকতে পারতো। একদিন তো এক মুরগির বাচ্চা বলেই বসলো ও একটা পাগল, ওর চিকিৎসার দরকার। মুরগির বাচ্চার নিজেরও মাঝেমাঝে তাই মনে হয়, হয়তো পাগলই সে নাহলে এমন করে কেনো ও। সবার মতো সবকিছু মেনে নিয়ে ও কেনো চলতে পারেনা, হাসি আনন্দে মেতে উঠতে পারেনা। এই নিয়ে উল্টো সেই মুরগিকেও অনেক কথা শুনিয়ে দিতে ও ছাড়ে না।কিন্তু ওর আবার অনেক কষ্টও হয় মনে- কেউ কি নেই যে ওকে বুঝতে পারবে, ওর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে! ওর মনে হয় এই যে এতোগুলো মুরগির বাচ্চা ওরা একসাথে বড় হচ্ছে, ওদের মতো আরও কয়েক ব্যাচে ছোট ছোট মুরগির বাচ্চা ওদের সামনেই আছে এইটা স্বাভাবিক ব্যাপার? নাকি অস্বাভাবিক?! একটু বড় হতেই দেখে ওদেরকে অন্য রুমে সরানো হয়েছে, সে জায়গায় একেবারে ছোট ছোট আরও মুরগির বাচ্চা আনা হয়েছে। অন্য রুমে নিয়ে যখন ওদেরকে রাখা হচ্ছে ও দেখতে পেলো অন্য এক খাঁচায় ওদের থেকেও বড় কিছু মুরগি রয়েছে। কোনকিছু বুঝে উঠতে না পেরে ও চুপ হয়ে ভাবছে এমন সময় অন্য খাঁচার এক বড় মুরগি ওকে ডেকে আলাপ জুড়ে দিলো। সেই মুরগিটা অনেক কিছু জানে। ও জানালো ওরা সবাই হলো গিয়ে চাষের মুরগি। আরও অনেক রকমের মুরগি আছে। যেমন কিছু মুরগির চাষ হয় খোলা জায়গায় যেখানে চারপাশ ঘেরাও দেয়া থাকে; কৃত্রিম আলোর বদলে সূর্যের আলো পায় ওরা। কিছু মুরগি আছে যাদেরকে ছেড়ে দিয়ে রাখা হয়, যেখানে ওরা নিজেরা খাবার খুঁজে খায় আবার মুরগীচাষীর থেকেও খাবার পায়। দিন পেরিয়ে রাত হলে ওরা চাষীর তৈরি করা খুপরিতে ঢুকে পড়ে, আবার সকাল হলেই সেখান থেকে বেড়িয়ে আসে। ও জানালো মুরগীচাষীর মুরগিরা বেশ স্বাধীনতা উপভোগ করে, শুধু তাই নয় শেয়াল-ওয়াপের(বনবিড়াল) হাত থেকে সুরক্ষাও নিশ্চিত করে সেই চাষী! এরপর সেই মুরগি বলতে থাকে-অতো স্বাধীনতা না থাকলেও যদি মা-বাবার আদরে ও বড় হতে পারতো তাহলে জীবনটা বেশ ভালোই কাটতো। এই সময় সেই ছোট মুরগি অবাক হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে বসে- মা-বাবাও থাকে নাকি মুরগিদের?! এর উত্তরে সেই বড় মুরগি জানালো থাকে বৈকি, মা-বাবা ছাড়া মুরগি কোথা থেকে আসবে! মোরগ আর মুরগি মিলেই না মুরগির বাচ্চা হয়। মুরগির বাচ্চা জিজ্ঞেস করে- তাহলে তাদের মা-বাবা কোথায়? ওদেরকে দেখা যায় না কেনো?! এই প্রশ্নে সেই বড় মুরগিটি কিছুক্ষণ কি ভেবে নিয়ে বলে অতকিছু জেনে আর কি হবে?! এই খাঁচা থেকে কি আমরা ছাড়া পাবো কোনদিন? ছোট মুরগিটি জিজ্ঞেস করে ছাড়া পাওয়ার কোন উপায় নেই?! সেই সময় বড় মুরগিটি বলে কই তাদের আগেও তো অনেক মুরগি এভাবেই জীবন কাটিয়েছে। এইসব জ্ঞান তো ও পেয়েছে ওভাবেই, ওকে বলে গিয়েছে অন্য এক মুরগি; সেই মুরগিকে জানিয়ে গিয়েছে অন্য আরেক মুরগি, এভাবেই তো চলছে কত যুগ ধরে। সেই বড় মুরগিটি মুরগির বাচ্চাকে জানালো ওর বিদায়ের সময় এসে গেছে, তবে তার আগে আরও কিছু বলার আছে ওকে। সে জানালো এই ভুল করেছে ওদেরই পূর্ব-পুরুষেরা। ওদের পূর্ব-পুরুষেরা যদি বন ছেড়ে গৃহস্তের ঘরে আশ্রয় না নিতো, তাহলে হয়তো আজকের এই পরিণতি ওদের ভোগ করতে হতো না। আফসোসের সাথে ও বললো যে মুরগির জাত এক সময় উড়ে বেড়াতো পারতো, আর আজকে তারা হাটতেই ভুলে গেছে। বিশাল খোলা প্রান্তরে ঝলমলে আলোতে এই মুরগিরাই এক সময় চড়ে বেড়িয়েছে, ঘর বেঁধেছে, স্বপ্ন বুনেছে; আর আজ সেই মুরগিরাই অন্ধকার ঝুপড়িতে ছোট্ট খাঁচায় বন্দী। যদিও বনে জঙ্গলে বিপদ-আপদের ভয় ছিলো, তারপরও তো স্বাধীনতা ছিলো। সেই ভয়ে অন্যদের অধীনস্ত হয়ে বন্দী জীবন যাপনের তো মানে নেই কোন। সেই বড় মুরগি বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত ছোট মুরগিকে অনেক কিছু জানিয়ে গেছে; এজন্য মনে মনে ছোট মুরগি অনেক খুশি। সে ভাবতে থাকে এতদিন ও যা জানতে চেয়েছিলো যেসব কথা, আজ সে জেনে গেছে। ওর যে ব্যাপারে আফসোস ছিলো তাও ঘুঁচে গেছে। শেষমেশ কেউ তো তাকে বুঝতে পেরেছে- এই বা কম কি?! মুরগির বাচ্চা এখন স্বপ্ন দেখে খোলা আকাশের নীচে আলো ঝলমল জঙ্গলে উড়ে বেড়ানোর। ও বিশ্বাস করতে চায়- এই স্বপ্নও একদিন ঠিক সত্যি হবে! ওর সাথের সবাইকে ও বলে যায়- স্বপ্ন সত্যি নাও হতে পারে, স্বপ্ন দেখায় তো দোষের কিছু নেই! স্বপ্ন নিয়েই তো সবাই বাঁচে!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121