Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

ছোটবেলায় দেখেছি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সেলাই মেশিন। অনেকের বাসায় সেলাই মেশিন না থাকলেও সুই সুতায় হাতেই সেলাই হতো, জামায় কারুকাজ করতো, কাঁথা সেলাই করতো। এরপর এই কাজগুলোকে সামাজিকভাবে অবহেলার চোখে দেখা শুরু হলো, কিংবা বলা চলে আস্তে আস্তে মানুষ সরে আসলো। কারন আর কিছুই না ওইসব ছোটখাটো কাজে সময় নষ্ট না করে টেইলার্স এ গেলেই তো ভালো! স্বচ্ছল পরিবারের কেউ সেলাই করে সময় নষ্ট করবে কেনো, তার থেকে মোটা আয়ের সাথে সামাজিকভাবে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন পদে অধিষ্ঠিত হওয়াই যেনো মানুষের মূল টার্গেট হয়ে গেলো। ডাক্তার, ইঞ্জনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার এইসব পদে না হলেও অন্যসব পদ যেমন শিক্ষক, পুলিশ, এসপি, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, উকিল-মোক্তার, জজ, ব্যাংকিং ইত্যাদি পেশা বেছে নেয়ার প্রতিযোগিতা; নিতান্ত তাও না হলে সরকারী যেকোন শ্রেণীর পেশা বেছে নেয়াই মানুষের মূল লক্ষ্য হয়ে দাড়ালো। অথচ পশ্চিমা বিশ্বে মানুষের পেশার কথা জিজ্ঞেস করলে গর্বের সাথেই বলে যে সে বাসা-বাড়ির ফ্লোরের কাজ করে, মানে আর কি wooden ফ্লোর, কিংবা টাইলসের ফ্লোরের কাজ করে। মোটকথা সে কাঠ কিংবা টাইলস লাগায়। এই কাজ বাংলাদেশের নিচুশ্রেণীর কাজ বলে গণ্য করা হয়, এমনকি যারা এই কাজ করে তারা তেমন পদের না এমনই ধারনা পোষণ করে সবাই। এছাড়া কৃষিকাজ, জেলেদের কাজ, তাঁতি, মিস্ত্রি, কামার, কুমারদের কাজ আস্তে আস্তে গুটিয়ে এখন প্রায় সবাই পেশাজীবী; যারা এখনও এইসব পেশায় যুক্ত তারা নিতান্ত নিরুপায় হয়েই যেনো এগুলো করছে। অথচ পশ্চিমা দেশগুলোতে এদের কামারদেরকে কত উচ্চমূল্য দেয়া হয়, এদের তৈরি করা জিনিস কতটা সমাদৃত ও উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় সারা বিশ্বে। মাঝি, জেলেদেরও আলাদা স্থান আছে, ওদেরকেও পেশার জন্য ছোট করা হয়না; বরং যারা এই পেশায় আছে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাবসা ধরে রেখেছে বলেই তাদের আলাদা গুরুত্ব আছে। কৃষিকাজ যারা করে তাদেরকেও মানুষ অসহায়, গরীব বলেই ধরে নেয়, অথচ পশ্চিমা বিশ্বে এই পেশায় যারা আছে তাদের সামাজিক মর্যাদা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের থেকে কোন অংশে কম না। এই যে সব মূলধারার পেশা এইসব পেশা ছাড়া একেকটা সমাজ টিকেবেই না, সেইসব পেশাকে মানুষ তুচ্ছজ্ঞান কখন করে? তখনই করে যখন তারা শেকড় থেকে অনেক দূরে সরে আসে। ঠিক কখন থেকে এই সংযোগটা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে ঠিক করে বলা যায় না। কেউ শখ করে সেলাই করে এমন ঘটনা বেশ বিরল, পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ে সেটাও দেখা যায় কদাচিৎ; যারা সেলাই করে তারা যেনো অনেকটা নিরুপায় হয়ে পেটের তাগিদেই করে। মানুষজনের মধ্যে ধর্মচর্চা অনেক বেড়ে গেছে, নীতিকথাও আমরা অনেক ছাড়ি কিন্তু কাজের বেলা সবাই পাজি হয়ে যাই। বাগান করবে তাতেও অবহেলা, তার থেকে আরও অনেক গুরুতপুর্ন কাজ আছে। অফিস ও পড়াশোনার বাইরে টিভি দেখা, মোবাইল নিয়ে সময় কাটানোই মানুষের অবসরের কাজ হয়ে দাড়িয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমিই বা এতো দাপটে কিভাবে বলি যে; আমার পরিবারের লোকজন এরকম না, আমি ওমন না। যাকিছু হয় সবার অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়েই তো হয়। যাই হোক সেলাই করতে পারাও যে একটা সক্ষমতা, সবার যে সেটা থাকেনা এটা শিখেছি আমি জার্মানিতে এসে। আমি খুব সেলাই শিখেছি এমন দাবি করছি না। তবে চাইলে আমি সেলাইয়ের লাইনেও কাজ করার সক্ষমতা রাখি এটা জেনে ভেতরে এক বোধের জাগরণ হয়েছে। চাইলেই সবাই সব কাজ পারেনা। মাঝির কাজ যদি তাঁতি পারতো তাহলে সে মাঝিই হতো। মূলধারার যে পেশা সেগুলো মোটেই নগণ্য না, তবে আমাদের সমাজের প্রেক্ষিতে এমন ধারা দাড়িয়ে গেছে যেখানে কোন বাবা-মাই চাইবে তাদের সন্তানেরা সেইসব পেশা বেছে নিক। সবার একটা স্বপ্ন বড় বড় পদে তাদের সন্তানেরা অধিষ্ঠিত হবে, না হতে পারলে জীবন তাদের ব্যার্থ; না খেয়ে মরতে হবে! এই যে মানসিকতা এটা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, এর থেকে সচেতনভাবে বের হয়ে আসতে না পারলে আমাদের যে স্বাভাবিক সৃষ্টিশীল সত্তা তা প্রকাশের সুযোগ পাবেনা। এই কাজগুলোতে সবাইকে ফিরতে হবে তাও না। ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদেরকে আমরা এইসব কাজে expose করতে পারি। দেখে নিতে পারি কে কোন কাজগুলো করার সক্ষমতা রাখে যা কিনা মোটামুটি এখানকার প্রি-স্কুল থেকেই শুরু হয়। সেলাই, বাগান, তাঁতির কাজ, সিরামিকের কাজ, ফ্লোরে টাইলস লাগানোর কাজ, মাছ ধরার কাজ, নৌকা বাওয়া, গাছ লাগানো, কাঠসহ অন্যসব মিডিয়ায় ছোটখাটো শিল্পকর্ম, শখের পশু-পাখির পালন এইসব কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা। এতে করে তারা এইসব কাজগুলোতে সরাসরিভাবে পরবর্তিতে যুক্ত না থাকলেও এইসব শ্রেণী-পেশার মানুষদের কাজের সঠিক মূল্য দিতে জানবে, পাশাপাশি নিজেদের যার যার স্বভাবগত যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে পরিচিত হয়ে আত্নবিশ্বাসের সাথে জীবনের পথে চলতে পারবে। আরেকটা ব্যাপার হবে তাহলো মানুষের যে সৃজনশীল সত্তা তা বিকাশের জায়গা পেলে মানুষগুলোও সুস্থ হয়ে উঠবে মানসিকভাবে, সেইসাথে কমে যাবে রোগ-ব্যাধিও। সুস্থ মনের লক্ষণই তো হলো যখন মানুষের আচার-ব্যবহার এমন হয় যে খাওয়ার প্রয়োজন আছে জেনেও বেশী বেশী খাওয়াটাই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় না, জামা-কাপড়ের প্রয়োজন আছে অস্বীকার না করে নতুন নতুন জামা-জুতো, ব্যাগ-কসমেক্টিক্স কেনার জন্য প্রতিযোগিতায় নামেনা। শরীরের সাথে মানুষের মনও জড়িয়ে থাকে ওতপ্রোতভাবে; মন যখন সুস্থ থাকবে, সুস্থ হয়ে উঠবে দেহও।