অবিভক্ত ভারত না হলেও তো অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের স্বপ্ন দেখা যায়!

অখণ্ড ভারতকে দ্বিখন্ডিন্ত করার চিন্তা ব্রিটিশ সরকারের অনেকদিনের বাসনা ছিলো। রাজনৈতিক বিদ্রোহ দমনে এর থেকে ভালো কৌশল আর নেই। বাংলা প্রদেশ বিভাজনের যে প্রস্তাবনা ছিলো, তার মূলেই ছিলো ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে টেনে আনা। মুসলিম-হিন্দু এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিরাজমান সমস্যাগুলো তুলে ধরে এরা এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিদ্বেষ উসকিয়ে দিয়েছিলো। বাঙলা প্রদেশকে বৃটিশরা ভাগ করে না যেতে পারলেও এরা বাঙালী জাতিসত্ত্বাকে দুই আলাদা অংশে ভাগ করে গেছে। মূলত সুবিধাবাদী ও সুবিধাবঞ্চিত দুই দলের মধ্যে ধর্মীয় ফর্মুলা গুলে দেয়া হয়েছিলো, যেটা মানুষজন খুব খেয়েছিলো। হিন্দু মুসলিম বৈষম্যের নাম করে পুরো এক জাতিকে বিভক্ত করে দেয়া চারটিখানি কথা না। যেটা ব্রিটিশদের স্বপ্ন ছিলো সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিলো বাংলাদেশের পাকিস্তানের সাথে এক হয়ে ভারত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া। অবিভক্ত ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে যে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায় তা ছিলো ব্রিটিশ সরকারের বহুদিনের প্রচেষ্টার সফলতা। ভারত বিভক্ত হওয়া নিয়ে আমরা ব্রিটিশ সরকারকে দোষ দিতে পারি, কিন্তু তা হবে নিতান্তই দায় এড়িয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার সেপার। এই যে ভারত সরকার কিছু হলেই পাকিস্তানের দোষ দেয়, সেটাও দায়িত্বে ব্যার্থতা অস্বীকার করে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে সুখ খোঁজা ছাড়া আর কিছুই নয় । একইভাবে পাকিস্তানও তাই করে। বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে যদি তাকাই দুই প্রধান দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি এই দুই দলও একই পন্থা ব্যাবহার করে থাকে। আওয়ামীলীগ ছড়ায় পাকিস্তান বিদ্বেষ ও বিএনপি ছড়ায় ভারত বিদ্বেষ। খুবই বস্তাপচা এই উপায় ব্যবহার করেই এরা টিকে আছে, আর মানুষেরাও সেন্টমেন্টে চালিত বলে ভেড়ার মতো এদেরকে অনুসরণ করে যায়। বারবার মনে হয় এর থেকে নিস্তারের উপায় কি? ইউরোপেও এক সময় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব লেগেই ছিলো। সেই ইউরোপ এখন একজোট হয়ে চলে। আলাদা আলাদা দেশ হিসেবে থেকেও এদের মধ্যে যে ইউনিয়ন তার সুবিধা ভোগ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর অধিবাসীরা। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় জনগণের মধ্যে এই ধরনের একতা আসার কোন সম্ভাবনা কি অদূর ভবিষ্যতে আদৌ আছে?! খুব জানতে ইচ্ছে করে। ভারত ভালো, পাকিস্তান খারাপ এই দলাদলি আর ভালো লাগেনা; দেখতে দেখতে একঘেয়ে লাগে। দেশের যত বুদ্ধিজীবী তাদের মধ্যেও দুই দলের পক্ষ নিয়ে কেবল সাফাই গাইতে কিংবা নিন্দা করতে দেখি। এইসব বাদ দিয়ে কি নতুন পন্থা নেয়া যায় না? মোদী সরকারকে ইসরায়েলের সাথে দহরম মহরম করতে দেখলে বোঝা যায় রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের উস্কানিমুলক বার্তা। রাজনীতি সহজ নয় কিন্তু রাজনীতির নামে যদি public sentiment ব্যাবহার করা হয়, ধর্মকে বিভাজনের হাতিয়ার বানানো হয় তাহলে তা সব সময়ই ভয়ংকর।

হাসিনার সরকার পতনের পর ভারতের কাছে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। সেই থেকে বাংলাদেশের জনগনের দাবী হাসিনাকে মোদী বাংলাদেশে পাঠিয়ে না দেয়া পর্যন্ত ভারতের সাথে সম্পর্কের কোন উন্নয়ন হবেনা। রাজনৈতিক নেতারা জনগণের সেন্টিমেন্টকে ব্যাবহার করে বলেই তারা কোথাও এই ব্যাপারটা ক্লিয়ার করার প্রয়োজন মনে করেনা যে কোন দেশের সাধারণ নাগরিকও যদি বিদেশী কোন সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চায় আর সেই সরকার আশ্রয় দেয় তাহলে আইগতভাবে কোনভাবেই তাকে সেই দেশে পাঠিয়ে দেয়ার নিয়ম নেই। কারন সেক্ষেত্রে দেশীয় বিচার প্রক্রিয়ায় সেই আশ্রিতের পক্ষে সুশাসন নিশ্চিত না হওয়ার আশংকা থাকে।

তখন হাসিনার সরকারের কেবল পতন হয়েছে, দেশে হাসিনার বিরুদ্ধে জনগণ ভয়ানকভাবে ক্ষিপ্ত। আমিও বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছি অনেকটা চুপচাপ থেকেই। এরই মধ্যে পরিচয় হয়েছে প্রভুদার সাথে, যিনি কিনা পঞ্চাশ বছর হবে প্রায় জার্মানিতে আছেন। বোনকে জানাচ্ছিলাম প্রভুদার সাথে পরিচয়ের চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা। আরও জানিয়েছিলাম সে সময়কার বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ওনার উদ্বেগ প্রকাশের ঘটনা। বোন শুনে বলে ইন্ডিয়ানদের বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সব সময় নাক গলানো স্বভাব। বোনের কথায় অবাক হইনি, যে দেশে আবেগের চাষ হয় সবক্ষেত্রে, সেখানে এর বাইরে কীইবা প্রত্যাশা করা যায়; আর সে সময় তো আবেগীয় তীব্রতা বেশ জোরালো ছিলো সবার মধ্যে। বোনের কথায় অবাক হইনি, যে দেশে আবেগের চাষ হয় সবক্ষেত্রে, সেখানে এর বাইরে কীইবা প্রত্যাশা করা যায়। জাতিকে দুই দলে ভাগ করে দিলে বরং জমে ভালো। আর পাবিলিকের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যাবহার করেই তো টিকে আছে বর্তমানের রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121