আব্রাহামীয় ধর্ম ও Premature enlightenment এর উদাহরণ

আব্রাহামীয় যে কয়টি ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো সারা বিশ্বে এর সবকয়টিই নিয়ন্ত্রণের মানিসিকতায় ছড়িয়েছিলো। মুসা থেকে জেসাস(ঈসা আঃ) সবাইকে নানারকম performance দেখাতে হয়েছিলো তাদের ঐশ্বরিক ক্ষমতা প্রমাণের জন্য। নবিজী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর কাহিনীও আমরা হয়তো শুনে থাকবো তার সময়কার লোকজনেরা তার কাছ থেকে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শেনের দাবী তুলেছিল। এই যে ঐশ্বরিক/অলৌকিক ক্ষমতা প্রমাণের দাবী সেটা যুগ যুগ ধরে প্রায় সব পয়গম্বরদের কাছেই করা হয়েছিলো। মুসার অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন কিংবা ঈসার যে অলৌকিক ক্ষমতার কথা আমরা জানতে পারি এর সবই একটা ব্যাপার নিশ্চিত করে, আর তা হলো এদের কেউই সেই পর্যায়ে পৌছতে পারেননি যে পর্যায়ে মানুষ নিজেকে প্রমাণের যেকোন ধরণের চেষ্টা এড়িয়ে যায়। এই যে প্রদর্শনের আকাক্ষা বা চেষ্টা এসবই অকাল বোধোদয় (Premature enlightenment) কে ইঙ্গিত করে। আমাদের নবীজী সাঃ এমন দাবীর মুখে অনেক সদুত্তর দিলেও তিনি কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি, এমনকি তার যে কোন অলৌকিক ক্ষমতা ছিলো না, তিনি যে কোন ঈশ্বরিক ক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে পারেননি এই নিয়েও আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। যেকোন ধর্ম প্রচলনের শুরুতে ব্যাপক বাঁধা আসলেও কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সেই সব ধর্মের fan কিংবা follower এর অভাব পড়েনা। কিন্তু যারা fan বা follower তারা ধর্মের কোন ধার ধারেনা, সত্যটা কি তা care করেনা। তারা একটা প্রতিষ্ঠিত পরিচয়ে নিজেদেরকে পরিচয় দিয়েই ধন্য হয়ে যায়। প্রয়োজনে defensive, ক্ষেত্র বিশেষে অন্য ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি আক্রমনাত্নক(offensive) আচরণও করে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি ধর্মগুলো মহত উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা পেলেও সুবিধাবাদী লোকজনের কারনে প্রতিষ্ঠিত ধর্মের প্রায় সবই ধর্মীয় মূল্যবোধ শূন্য কঙ্কাল মাত্র, যেখানে ধর্মীয় আচারই সার। ধর্মীয় বোধ খুব কম মানুষের মধ্যেই খেয়াল করা যায়।

ইব্রাহীমের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা আর বাংলাদেশের কিছু স্থানীয় আলেম-ওলামার শিরক ঠেকাতে বটগাছ কেটে ফেলার ঘটনার মধ্যে একটা মিল আছে। মিলটা কোথায়? উদাহরণস্বরূপঃ ছোট্ট শিশু পুতুল খেলতে পছন্দ করে, ওদিকে মা-বাবাও ছোট বেলায় পুতুল না খেললেও অন্যকোন খেলাধুলা করে থাকবে। বড় হয়ে তাদের কাছে এই পুতুল বা যেকোন ধরণের খেলাধুলা অনর্থক মনে হতে পারে, কিন্তু ছোট্ট শিশুর পুতুল খেলা ভেঙ্গে দিবেনা। বরং পুতুল খেলার বায়না ধরলে কিনে দিবে। যে মা-বাবা সন্তানের খেলাধুলা অনর্থক মনে করে সব ধরণের খেলাধুলা নিষিদ্ধ করে দিবে তারা শিশুর সরল শৈশবকালের থোড়াই কেয়ার করে। সেইসব বিকারগ্রস্ত মা-বাবা productive কিছু চাইতে গিয়ে সন্তানের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নেয়, আর এর সবটাই নিয়ন্ত্রনের মানসিকতায় কিংবা নিজেকে অসুখী-অসফল জীবন থেকে উত্তরণের তাড়নায় করে। এমন অনেক মা-বাবাকে দেখেছি যারা সন্তানের খেলাধুলার সময় চোখ রাঙিয়ে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দিয়েছে। এমন অনেক মা-বাবা আছে যারা সন্তান নষ্টে না পায় এই ভয়ে খাঁচার পাখির মতো বাসায় বন্দী করে রেখেছে, যারা বারান্দায় দাড়িয়ে অন্যদের খেলা দেখে খাঁচায় বন্দী পাখির মতোই ছটফট করেছে। ইব্রাহিমের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা তৎকালীন সময়ে যেমন দণ্ডনীয় অপরাধ ছিলো, আজেকের সময়ে এসেও তা দণ্ডনীয় অপরাধ। মূর্তি পূজা অপরাধ হলেও হতে পারে, কিন্তু যারা মূর্তি পূজারিদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করে তারা আরও বড় পাপী। কিভাবে বোঝা যায় এরা সবাই ভণ্ড ধার্মিক? এরা খুব মজা পায় অন্যদের ধর্মীয় আচার নিয়ে ব্যাঙ্গ-বিদ্রূপ করতে কিন্তু যখন অন্যরাও তাদের ধর্মীয় আচার নিয়ে কোন ধরণের তীর্যক মন্তব্য করে তখন তারা আর নিতে পারেনা, শুরু হয়ে যায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মিছিল। অথচ যারা অল্প কিছু ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে ধরে নেয় ধর্মের সবটুকু বুঝে গেছে তারাই ভয়ংকর হয়ে থাকে। এজন্য মনে হয় একটা কথা প্রচলিত আছে অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। উদাহরণস্বরূপঃ ফুটবল খেলা আমি নিয়মিত দেখিনা, কোনদিন খেলিনি পর্যন্ত, টুকটাক নিয়ম জানলেও প্রকৃত অর্থে তাকে জানা বলে না। এই আমি কোন এক দল বেছে নিয়ে বিপক্ষদলের ফ্যানদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছি, কেবলমাত্র খেলার ছলে, মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখতে বেশ মজা লেগেছিলো স্বীকার করতে হয়। তার মানে এই নিতান্তই প্রতিক্রিয়া দেখতে বা দেখাতে পছন্দ করি বলেই ওমন আচরণ করেছি ইউনিভার্সিটি হলে থাকতে। এখানে মূল খেলার থেকে ফ্যানদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জড়ানো বেশ বিনোদনমূলক! এ যেনো অনেকটা এক গবেট আরেক গবেটকে নিয়ে হাসাহাসি করার মতো ব্যাপার। এই ব্যাপারটা নিয়েই বাংলায় একটা গান আছে- “এসব দেখি কানার হাট-বাজার….”। নবী ইব্রাহিমের মধ্যে ধর্মীয় বোধের যে জাগরণ হয়েছিলো তা পরিপূর্ণতায় পৌছলে তিনি কখনোই মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতেন না। ধর্মীয় বোধের যে জাগরণ এটা একটি যাত্রাপথ হিসেবে যদি চিহ্নিত করা হয় তাহলে পথের শুরুতেই কিংবা মাঝপথে এসেই অনেকের মনে হতে পারে যে, তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে, আর এটা একটা ভ্রম মাত্র। The Prophet Muhammad ﷺ is reported to have said to his followers after returning from a battle: “We have returned from the lesser jihad to the greater jihad.” When asked, “What is the greater jihad?”, he replied, “It is the struggle against one’s nafs (self/ego/desires/selfishness and evil inclinations)“.

বাংলায় অনুদিত এরকম একটি হাদিস হলোঃ “প্রকৃত মুজাহিদ (যোদ্ধা) হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজে নিজের নফসের (কুপ্রবৃত্তির) সাথে জিহাদ করে। আর প্রকৃত মুহাজির (হিজরতকারী) হচ্ছে সে, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকে।”
— (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৪০২৪; হাদিসবিডি)

একইভাবে পারস্য মাওলানা ও কবি রুমি বলে গেছেনঃ We fight a fierce war within. What is the point of fighting with others?”
— Rumi

জার্মান দার্শনিক Nietzsche ও প্রায় একইভাবে সতর্ক করে গেছেনঃ “He who fights with monsters should look to it that he himself does not become a monster. And if you gaze long into an abyss, the abyss also gazes into you”.

অন্যদিকে সুইস psychiatrist and psychotherapist কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং(Carl Jung) বলে গেছেন- “We have to realize, quite dispassionately, that whatever we fight about in the outside world is also a battle in our inner selves.” ~ Carl Jung

ধর্ম মানুষকে মুক্তির পথ দেখায় ঠিকই কিন্তু মানুষ ধর্মকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে। ধর্ম শান্তির কথা বললেও মানুষ ধর্মের নামে সব সময়ই অশান্তি সৃষ্টি করে গেছে। সমস্যাটা কোথায় ধর্মের মধ্যে, নাকি মানুষের মধ্যে? যারা নিয়মিত ধর্ম চর্চা করে বা নিজেদের ধার্মিক বলে দাবি করতে পছন্দ করে তারা আদৌ কি উদ্দেশ্যে ধর্ম চর্চা করছে?

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121