ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না !

একটা ব্যাপার খেয়াল করলে দেখা যাবে সারা বিশ্বে অবেসিটি(Obesity) রেট অনেক বেড়ে গেছে। কিছুদিন আগেও এই বিপুল মাত্রায় অবেসিটি (obesity) ছিলোনা। বেশীরভাগেরই হরমোনাল কিংবা থাইরয়েডের সমস্যা বলে জানা যায়। এতো ডাক্তার, বদ্যি, ওষুধ- পথ্য, সামপ্লিমেন্ট, ডায়েট প্লান এগুলোর কিছুই কাজ করছে না, কেনো? যারা মোটা তাদেরকে দেখে অন্যরা যেমন বিচার(judge) করছে আবার যারা মোটা না তাদের দিকেও মোটারা একজোট হয়ে আক্রমনাত্নক হয়ে উঠছে। উদাহরণস্বরূপঃ আমার ছেলে শুকনা বলে, আমি সফল মা না এরকম নানা মন্তব্য শুনে শুনে কান ভরে গেছে যেমন; তেমনি অনেক সময় self-doubt ও এসেছে মনে যে, দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করার যোগ্যতা আমার নেই। জার্মানিতে এসে ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছি সেই সময় শিওর হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ছেলের ওজন-তজন সব ঠিকঠাক আছে কিনা। সে জানালো সবই তো ঠিকই দেখছি, তখন জানালাম ছেলে শুকনা সবাই বলে তো, তাই চিন্তা আসে মনে। তখন সেই ডাক্তার জানিয়েছিলো মানুষের বলার মানুষ বলবে, আপনার যা করার আপনি করবেন; এইসব নিয়ে এতো ভাববার কিছু তো নেই! আজকে এসে বলছেন ছেলেতো শুকনা কি করা যায়?! ভবিষ্যতে এসে বলবেন ছেলে তো ভীষণ মোটা কি করি বলেন?! আমি ডাক্তারের logic এ যুক্তি খুঁজে পেলেও মানসিক সান্ত্বনা পাইনা। এক গ্রীক বান্ধবীর মা আমার ছেলেকে দেখে জানান ওর একদম সুন্দর স্বাস্থ্য, আর আমার নাতিটা কেমন মোটা! আমি বুঝিনা মহিলা সত্যি বলছেন নাকি সান্ত্বনা দিচ্ছেন! ওদিকে ছেলের দাদা-দাদী পর্যন্ত ছেলের চিকন ঠ্যাং দেখে হেসে গড়াগড়ি যায়। আর নিজের মা শুনাতে ছাড়েনা চাকরি-বাকরি করে তিন সন্তান পেলে পুষে বড় করেছে তারপরও আমাদের স্বাস্থ্য এতোটা খারাপ ছিলো না।

রুমির কথা মনে পড়ে যায়- “Half of life is lost in charming others.
The other half is lost in going through anxieties caused by others.
Leave this play. You have played enough.”

সারাজীবন অন্যের কথা ভেবে ভেবেই বড় হয়েছি। অন্যেরা কি ভাবছে, অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত করছি কিনা তাই নিয়ে মগ্ন থাকতাম সারাক্ষণ। এরপর কোন এক সন্ধিক্ষণে বোধদোয় হলে পড়ে সবার কথা কেয়ার না করলেও, নিজের পরিবারের সদস্যদের কথার গুরুত্ব দেয়া শুরু করলাম শুধু। কিন্তু সেই people-pleasing mentality তখনো ছিলো। নিজের কেমন লাগছে না লাগছে, কোথায় improve কিংবা সংশোধন-পরিমার্জন করা যায় তা বাদ দিয়ে মা-বাবারা সন্তুষ্ট আছেন কিনা তাই নিয়ে অস্থির হয়ে থাকতাম। এরপর এলো এক মাহেন্দ্রক্ষণ-অনেকে যারা সফল মা হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন তাদের সন্তানেরা মোটা হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন এবং এখন তারা বাচ্চা শুকনাকরন প্রকল্পে কাজ করে যাচ্ছেন। তখন বুঝলাম এই যে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা, সন্তানকে মোটা-তাজাকরনের প্রক্রিয়ায় দেখা যায় সেটা সুস্থ সমাজের লক্ষণ না। মায়েরা সন্তানের খাওয়ানোর পিছনে যে পরিমাণ শক্তির অপচয় করছে, সেটা যদি ঠাণ্ডা মাথায় বসে কেউ চিন্তা করে তাহলে বুঝতে পারবে এসবই বিকারগ্রস্ত আচরণ। বাচ্চাদের মধ্যে খাবারের আগ্রহই এই প্রতিযোগিতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খাবার খাওয়ার সময়ের অনুভূতি আর আনন্দদায়ক থাকছে না। মায়েরা চাপ নিয়ে খাওয়াচ্ছে, সন্তানেরা চাপ নিয়ে গিলছে। আস্তে আস্তে সেই toxic মানসিকতা থেকে বেড়িয়ে এসেছি কখন তা নিজেও বলতে পারবো না। কিন্তু এখন যখন অন্যদের দিকে তাকাই তখন মায়েদের জন্য যেমন আফসোস হয়, বাচ্চাদের জন্যও কষ্ট লাগে।

এক সময় খাবার ছিলো দুষ্প্রাপ্য, তাই খাবার সামনে পেলেই মানুষ গোগ্রাসে গিলতো। সেই গোগ্রাসে গেলার মধ্যে ভবিষ্যৎ খাদ্য সংকটের ভয় যেমন থাকতো, তেমনি থাকতো দীর্ঘদিন ভালো-মন্দ না খাওয়ার কারনে শারীরিক চাহিদা। কিন্তু এখন এই সময়ে মুষ্টিমেয় কিছু জায়গা বাদে খাদ্যে প্রতুলতা সবখানে। এখনও যদি খাবার খাওয়ার সময় একইরকম ভয়(fear) আর লোভ(greed/desire) নিয়ে খাবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে তেমন সমস্যা ছিলোনা, এর সাথে যুক্ত হয়েছে লজ্জা(shame) ও অপরাধবোধ(guilt)। এখন দেখা যায় বেশীরভাগ সময়ই মানুষ খায় আর এরপর পরপরই অনুশোচনায় (regret) ভোগে। এই যে এতোগুলো নেতিবাচক (negative) অনুভূতি(feelings) সবই মানুষের খাবার খাওয়া কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে। আধুনিক ভোগবাদী যুগে সবার motto হচ্ছে খাবে অনেক কিন্তু মোটা হবেনা। ভাবটা এমন যে (ভোগেই সুখ) maximum consume করতে পারলেই একজন মানুষ জিতে যায়; সেটা যে কেবল খাবার তা না, জীবন-যাপনের সবক্ষেত্রেই একই মনোভাব। কিন্তু বৈদিক পণ্ডিত আদি শংকরাচার্য পর্যন্ত বলে গেছেন যে খাবার গ্রহণের সময় মনকে দূরে রাখতে, এবং সচেতনতার সাথে আহার করতে। মানুষের মন আর আকাশের রং খেয়াল করলে দেখা যাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। শঙ্কা-ভয়, ভাবনা-দুঃশ্চিন্তা, ভয়-লোভ, লজ্জা-অনুশোচনা এইসবই ভীড় জমায় আমাদের মনে। এইসব অনুভূতিগুলো যদি পর্যবেক্ষণ করি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাহলে বুঝতে পারবো ওসব বেশীরভাগ সময়ই অহেতুক আমাদের মনে ভীর করে, সেগুলো পাত্তা না দিয়ে নিতান্ত প্রফুল্ল মনে যদি মানুষ খাবার খেতো তাহলে অনেক রোগ-বালাই আর থাকতো না। আমরা জানি শরীরের সাথে আমাদের মন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। একটায় ভারসাম্য হারালে অন্যটিও তাতে প্রভাবিত হয়।

আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো মোটা মানুষকে কেউই পছন্দ করেনা। কোন মেয়ে মোটা হলে বাজারে তার চাহিদা কমে যায়, তাই মোটা না হওয়ার এক ধরণের তাড়নায় ভোগে বেশীরভাগ মহিলা। মোটা হওয়া যেনো মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর কিছু এমন মনোভাব সবার মধ্যে কাজ করে। শরীর shape এ রাখা যেনো বিয়ে/প্রেমের বাজারে সফলতার চাবিকাঠি। একদিকে অনেক খাওয়ার বাসনা অন্যদিকে মোটা না হয়ে যাওয়ার চাপ সবকিছু মিলিয়ে বিপর্যস্ত সবাই। যারা সবার/সঙ্গীর validation কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে তাদেরকে এই বিষয়টা খুব বাজেভাবে প্রভাবিত করে। এই যে জিরো ফিগার ধরে রাখার মানসিক চাপ, এই চাপে পড়ে সবাই আরও ফুলে-ফেঁপে উঠছে দিনদিন। দুঃখজনক ব্যাপার হলো মানুষ তাদের নিজস্ব আবেগ অনুভূতি আর আলাদা করতে পারেনা, বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে। একদিকে যুদ্ধ-বিগ্রহের খবর, অন্যদিকে সেলিব্রিটিদের স্ক্যান্ডাল এইসবেই মানুষ ডুবে থাকছে, তাই তাদের নিজস্ব আবেগ-অনুভূতি তারা আর আলাদাভাবে অনুভব করতে পারেনা। বেশীরভাগ সময়ই এরা অন্যদের আবেগ অনুভূতিতে প্রভাবিত বলে আচার-আচরণে তারা মারাত্নকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল(reactive) হয়ে যায়। সেই বিচারে ভোগবাদী সমাজের এই সময়ে মানুষ কেবল বস্তুতে আটকে নেই, তারা ভোগ করছে অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় আবেগ-অনুভূতি যেখানে তার কোন সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই যে, সেখানে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কোনকিছুর পরিবর্তন আসতে পারে। বরং সেগুলো passively ভোগ করে তারা একেকটা trigger machine এর মতো আচরণ করছে, যেক্ষেত্রে কিছু সিচুয়েশনে তারা মারাত্নকভাবে triggered হওয়ার জন্য তৈরি হয়েই থাকছে।

The thing is conscious consumption makes anything harmless, whether it is food, information, feelings, desire. It is not merely about consuming less rather consuming wisely.

উদাহরণস্বরূপঃ এক ভদ্রমহিলা মোটা বলে হয়তো shaming এর স্বীকার হয়। নানাভাবে আমাকে খোঁচায় সে।মোটা বলে তাকে আমি অসুন্দর মনে করি কিনা সেইটা যেনো সে আমার মুখ থেকে বের করতে চায়। সে আমার কাছে explicitly বলে যে, সে সুন্দর না হেনতেন। হাস্যরস নিয়েই উত্তরে তাকে জানাই-আমিও তাই মনে করি। আমি তাকে বলতে যাই না যে সে সুন্দর। সে তখন তার পুরনো ইতিহাস নিয়ে এসে বলে যে, সেও এক সময় সুন্দর ছিলো, শুকনা ছিলো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি তখন বলি পুরনো ইতিহাস টেনে এনে কি প্রমাণ করতে চায় সে, আমরা তো তাকে সেই অবস্থায় দেখিনি। যাই হোক সে মোটা বলে হয়তো খারাপ feel করে সেটা আমি বুঝতে পারি, কিন্তু তাকে সান্ত্বনাও দিতে যাইনা। অনেকে আছে তাকে সান্ত্বনা দিবে, অনেকে বলবে মোটা হয়েছে তো তাই কি, সে এখনও সুন্দর। অনেকে তাকে দেখেই এড়িয়ে যেতে চাইবে ছোঁয়াচে কোন কিছুতে ভয় পাওয়ার মতো করে। আমি তাকে এড়িয়েও যাই না, সান্ত্বনাও দেই না। সে খাওয়ার সময়ও দেখেছি এটা বেশী খাচ্ছে সেটা বেশী খাচ্ছে বলে কড়াকড়ির শিকার হচ্ছে। এইসব দেখে মনে হয় সেই মহিলা খাবার খাওয়ার সময় মোটেও তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেনা। তবে সেই মহিলা মানুষকে খাইয়ে যেনো তৃপ্তি পায় বেশ! তাকে দেখি আর এক ধরণের চাপা কষ্ট লাগে, কারন যারা নিজের আবেগীয় অনুভূতি process করতে পারেনা তারাই যেনো সবার আবেগ অনুভূতিগুলো গিলে নিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠে। সেই মহিলা empathetic কিন্তু নিজের স্থূলতা নিয়ে সারাক্ষণ গ্লানিতে ভোগে, তাই যারা মোটা না তাদের প্রতি এক ধরণের ঈর্ষাও যেনো কাজ করে তার মধ্যে একইসাথে। সে একদিকে যেমন ভালোবাসে, অন্যদিকে সে আবার ভালোও বাসতে পারেনা! সারাক্ষণ এক দোটানায় দুলতে থাকে যেনো। সেই মহিলাকে বলেছিলাম আমি কি বললাম না বললাম সেটা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তার থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো সে নিজেকে ভালোবাসে কিনা, নিজেকে ভালবাসতে পারে কিনা! কারন আমি জানি নিজেকে যে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি, তাকে পৃথিবীর সবাই যদি ভালোবাসা জানায় তাহলেও সে সেটা বিশ্বাস করতে পারবেনা, ভাববে সবাই তাকে করুণা করছে কেবল!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121