তোমার ঘরে বাস করে কারা ও মন জানোনা!

ইবনে আরাবীর(Ibn Arabi) নামের সাথে হয়তো অনেকেরই পরিচয় আছে। আরব এই স্কলার একেধারে সূফী মিস্টিক, কবি ও মুসলিম ফিলোসফার ছিলেন। ইসলামিক চিন্তা ও ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারায় তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তার অনেক উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে একটি হলো আত্নাকে (self) বিভিন্ন স্তরে(level) সাজানো(mapping)। এই মত অনুযায়ী self বা আত্না কোন একক সত্তা (entity) নয়। একই মানব শরীরে আত্না ৭টি স্তরে(level) বিদ্যমান থাকে। তার মতে অধিকাংশ মানুষ আত্নার সবচেয়ে নিম্নতম স্তরে জীবন যাপন করে ও মৃত্যুবরণ করে অন্য স্তরগুলোর কথা না জেনেই।

এই মতে মানুষের নফসের (Nafs) সাতটি স্তরের উপর নির্ভর করে কে কোন স্তর থেকে অপারেট(operate) করছে। আমরা কে কোন স্তরে থেকে অপারেট করছি তা জানা যাবে ইবনে আরাবীর এই চিত্র/নকশা/ম্যাপ (map) থেকে। এখানে একেকজন একেক স্তরে অপারেট করছে জানতে পারলেও এটা মাথায় রাখতে হবে এই সাত স্তরের সব কয়টি স্তরই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সর্বোচ্চ স্তরে অপারেট করছে মানে এই না যে, সব সময়ই সেই স্তরেই সে অপারেট করে। শুধুমাত্র সিদ্ধিলাভ করা সাধু (realised saint) বা মহাপুরুষ-নারী বাদে আমরা সবাই এই সাত স্তরের বিভিন্ন স্তরে উঠানামা করি, মানে আমরা কোন এক স্তরে স্থির থাকিনা/থাকতে শিখিনি। এজন্য দেখা যায় মানুষ প্রেমে পড়ার সময় সর্বোচ্চ ৪র্থ স্তরে কিংবা আরও কিছুটা উপরের স্তরে কিছুদিন স্থির থাকলেও যখন প্রেমের অনুভূতি ফিকে হয়ে যায় তখন নিম্নতর স্তরে অপারেট করে অধিকাংশ সময়। আমরা দেখি সাধু পুরুষেরা জাগতিক যেকোন অবস্থায় অটল পাহাড়ের মতোই অটল থাকেন/থেকেছেন। আর আমাদের সাধারণদের মনে এই মেঘ এই আলো আসা যাওয়া করে যেনো। সাংসারিক দুঃখ-কষ্টে আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি যখন একমাত্র তখনই আমরা সৃষ্টিকর্তার সাথে চুক্তি(bergain) করি বা তার কাছে নিজেদের সমর্পন (surrender) করি, যার যার ধর্মীয়(সৃষ্টিকর্তার) নির্দেশ মতো চলতে শুরু করি যাতে করে আমরা নিঝঞ্ঝাট জীবন পেতে পারি। আবারও বলছি এই স্তরগুলোর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি স্তরেই অনেক কিছু শেখার আছে।

স্তর ১ নফস আল-আম্মারা( Level 1 Nafs al-Ammara)- আজ্ঞাকারী সত্তা (The Commanding Self)

এই হচ্ছে সেই স্তর যে স্তরে সবার শুরু হয় এবং অধিকাংশই সারাজীবন এখানেই রয়ে যায়, অন্য স্তরে উন্নীত না হয়েই। এখানে ব্যাক্তি সম্পূর্ণরূপে তার আকংখা ও কামনা-বাসনা (desire) দিয়ে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ মূলত আনন্দ(pleasure), দুঃখ-কষ্ট(pain), অহং(ego) এইসব আবেগীয় অবস্থা দিয়ে তাড়িত হয়ে থাকে। এখান থেকে যারা অপারেট করে তাদের কোন ধারনাই থাকেনা তারা যা করছে তার পেছনের কারনগুলো। তারা কেবল করে যায়, করার পেছনের কারন তারা কোনদিন অনুসন্ধানও করে দেখে না। এরা বেশীরভাগক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করে থাকে। এই স্তরের বেশীরভাগই ধার্মিক হয়ে থাকলেও ধর্মীয় যত কার্যকলাপ সবই করে যায় ভয়ে তাড়িত(out of fear) হয়ে কিংবা প্রতিদানের আশায়(reward/wanting paradise), সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিতান্তই ভালোবাসা(out of love) থেকে আরাধনা এই স্তরে হয় না।

স্তর ২ নফস আল-লাওয়ামা (Level 2 Nafs al-Lawwama) – অভিযোগকারী সত্তা (The Self-Accusing Self)

এই স্তরকে বলা হয় জাগরন স্তর। এই স্তরে মানুষ নিজেকে পর্যালোচনা(reflect on him/herself) করতে শুরু করে। ভালো কিছু করে যেমন সে মনে মনে উৎফুল্ল হয় তেমনি খারাপ কিছু করলে অনুশোচনায় ভোগে। এই স্তরে মানুষ সব সময় এক ধরণের (নিজের সাথে নিজেই) অন্তর্দ্বন্দ্বে পতিত হয়। খারাপ কিছু করার পর অনুশোচনা নিয়ে যখনই নিজেকে বদলাতে প্রতিজ্ঞা করে তখনই আবার আরেকটি মন্দকাজে জড়িয়ে পড়ে।

এই স্তরের ফাঁদ হলো অনুশোচনাই হয়ে ওঠে ব্যাক্তির আত্নপরিচয়(iedntity)। খাঁটি (sincere) যত ধার্মিক আছে তারা নিজেদেরকে সান্তনা বাণী শোনায় এই বলে যে- “যদিও আমি পারছিনা , তবুও তো আমার চেষ্টা আমি করে যাচ্ছি।” – “I keep failing but at least I keep trying.

স্তর ৩ নফস আল-মুলহামা (Level 3- Nafs al-Mulhama) – উৎসাহী সত্তা (The Inspired Self)

এই স্তরে এসে মানুষ পার্থক্যটা ধরতে পারে কোনটা আসলেই ভালো আর কোনটা ভালো নয় কিন্তু ভালো দেখায়। আশা-আকাংখা, কামনা-বাসনা (desire) মনে আসলেও, সেই বোধগুলো অনুভব করলেও সেসবে জড়িয়ে পড়ার আগে চিন্তা করে, ভালো-মন্দ বিচার করে নেয়। এখানে কেউ রেগে গেলেও রাগে নিয়ন্ত্রিত হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করে (reactive) না। এই স্তরে কোন কিছু বা কারও প্রতি আকর্ষিত (attraction) হলেও ব্যক্তি আবেগীয় উত্তেজনায় অন্ধ হয়ে যায় না।

এই স্তরে ব্যাক্তির কোনকিছু জানার থাকলে কাকতালীয়ভাবে সে উত্তর খুঁজে পেয়ে যায়। জীবন যেনো এখানে ব্যাক্তির আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে (responsive)এরকম অভিজ্ঞতা হয় এই স্তরে। এই স্তরে এসে ব্যক্তির মনে হতে পারে যে সে অভীষ্ট অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছে গেছে।

স্তর ৪ নফস আল-মুতা’ঈন্না (Level 4 Nfs al- Mutna’inna) – প্রশান্ত বা সুস্থির সত্তা (The Tranquil Self)

এই হলো সেই প্রথম স্তর যে স্তর নিয়ে কোরআনে বিশদভাবে/স্পষ্টভাবে (explicitly) প্রশংসা করা হয়েছে। এই স্তরে এসে ব্যক্তির যে অন্তর্দ্বন্দ্ব তার অবসান হয়। এখানে এসে ব্যক্তি কোনকিছু নিয়ে স্ট্রাগলে (struggle) যায় না, এখানে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাই ব্যাক্তির ইচ্ছায় পরিণত হয়। অর্থাৎ ব্যাক্তির জীবনে যা কিছু ঘটে তার সবকিছু ব্যাক্তি মাথা পেতে নেয়। ব্যাক্তির চাওয়া-পাওয়া এখানে তুচ্ছ হয়ে যায়। প্রার্থনার জন্য ব্যাক্তিকে আলাদাভাবে চেষ্টা(effort) করতে হয় না, কারন ব্যাক্তি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকেই তা করতে চায়। ব্যক্তিকে জোড় করে ধৈর্য ধরতে হয়না, কিংবা ধৈর্য ধরার ভাণ করতে হয়না, এখানে ব্যাক্তির মধ্যে আপনাআপনি ধৈর্য চলে আসে। সব ধরণের প্রতিক্রিয়াশীলতার(reactivity) শেষ এখানেই। এই স্তরে যারা অপারেট করে তাদের বেশীরভাগই শিক্ষকতায় নিয়োজিত, কারন তারা কেবল বয়ান দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, নিজেদের জীবনেও তা প্রয়োগ করে।

স্তর ৫ নফস আল-রাদিয়া (Level 5 Nafs al-Raadiya) – সন্তুষ্ট সত্তা (The pleased Self)

এই স্তরে ব্যাক্তির জীবনে যাকিছু ঘটে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘটে, বিশেষ কোন preference ব্যাক্তির থাকেনা। এইটা এজন্য না যে ব্যক্তি এখানে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে জীবনে বরং ব্যক্তি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করে যা কিছু জীবনে ঘটছে তার সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেতেই ঘটছে, ব্যাক্তি যা চায় তার থেকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাই উত্তম।

বলা যায় এই পর্যায়ে ব্যাক্তি কোন খারাপ খবর পেলেও সৃষ্টিকর্তার ফয়সালাকে মেনে নেয়- এখানে মেনে নেয়ার পর ব্যাক্তির ভেতর কোন অন্তঃর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় না, কিংবা ব্যাক্তি performative আচরণ করে না। মেনে নেয়া মানে সে মনের মধ্যে কোন ধরণের ক্ষেদ পুষে রাখেনা। বরং অনেক পরে এসেও সেই বিষয়ে সে মনে মনে সৃষ্টিকর্তার ফয়সালায় শুকরিয়া জ্ঞাপন করে। মন খারাপের অনুভূতি আসলেও ব্যাক্তি সৃষ্টিকর্তার ধার্য করা বিধান মেনে নিয়ে বিশ্বাসে অটল থাকে।

স্তর ৬ নফস আল-মারদিয়া (Level 6 Nafs al – Mardiyya) – সন্তুষ্টকারী সত্তা (The Pleasing Self)

পঞ্চম স্তরে ব্যাক্তি যেখানে সৃষ্টিকর্তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে থাকে অর্থাৎ ভালো-মন্দ যেকোন ধরনের পরিস্থিতিতে, এই স্তরে এসে সৃষ্টিকর্তা ব্যাক্তির উপর সন্তুষ্ট হয়। ব্যাক্তির ইচ্ছার সাথে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার এক হয়ে গিয়ে (aligned with divine will) ব্যাক্তি হয়ে ওঠে বিশুদ্ধ সৃষ্টি(pure instrument of divine will)। এই স্তরে এসে ব্যাক্তি আর পুরস্কার কিংবা সাজার ভয়ে কিছু করেনা। বরং অতিরিক্ত চেষ্টা বা তদবির ছাড়াই স্বভাবিকভাবে গাছ যেমন ফল দিয়ে যায় তেমনিভাবেই ব্যাক্তি তার কাজ করে যায়। প্যারাডক্স হলো যেই মুহূর্তে আমরা আল্লাহকে/সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা ছেড়ে দিই ঠিক সে মুহূর্তেই যেনো সে আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়।

স্তর ৭ নফস আল-কামিল (Level 7 Nafs al-Kamila) – পরিপূর্ণ/নিখুঁত সত্তা (The Perfected Self)

এই স্তরে এসে ব্যাক্তি সত্তা সৃষ্টিকর্তার নিকট এমনভাবে সমর্পিত হয় যে ব্যাক্তির ক্ষুদ্র সত্তা সৃষ্টি সত্তায় বিলীন হয়ে যায়। ব্যাক্তির বোধে আসে ব্যাক্তি সত্তা একটি ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব মাত্র যা চিরন্তন কোন এক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। ব্যাক্তি যেমন সৃষ্টিজগতের শক্তিধর কোন অস্তিত্ব একইসাথে ব্যাক্তি যেনো অতি অগণ্য কিছু। ব্যাক্তির প্রভাব(impact) যেমন ব্যাপক(vast) আকারে দেখা দিতে পারে অন্যভাবে বলা চলে একেবারেই তুচ্ছ (trivial । শেষ স্তরে এসে ব্যাক্তির মধ্যে অসাধারণ কোন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় না- বরং সাধারণের মতোই ব্যাক্তি ক্ষুধা পেলে খায়, নিদ্রা পেলে নিদ্রা যায়, প্রয়োজনের খাতিরে কাজ করে যায়। ব্যাক্তির মধ্যে না থাকে শ্রেষ্ঠত্ববোধ না থাকে মুক্তমনা হিসেবে জাহির করার প্রবণতা। না থাকে আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বাড়াবাড়ি (performance of spirituality) না থাকে enlightenment এর ফুলঝুরি। সচেষ্ট তাগিদে এই স্তরে পৌঁছানো অসম্ভব। এই স্তরে তখনই মানুষ পৌঁছে যখন সব চেষ্টা থেমে যায়, সব খোঁজের অবসান হয়, কেবল সরল অস্তিত্বটা রয়ে যায়(simple being is all that’s left)। ব্যাক্তি বুঝে যায় এটা পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠার দুঃসাধ্য কোন অভিযান নয় বরং ব্যাক্তি আগে যেমনটা ছিলো ঠিক তেমনটাই রয়ে গেছে, পার্থক্যটা হলো ব্যাক্তি তার শক্তির উৎস খুঁজে পেয়েছে আর তা জন্মের সময় থেকে তার ভেতরেই বিদ্যমান; যেমনটা সকল সৃষ্ট জীবের/অস্তিত্বের মধ্যেই সব সময় বিরাজ করে।

ইবনে আরাবির এই mapping অন্য আরও অনেক ধর্মের আধ্যাত্মিক mapping এর সাথে মিলে যায়। সে প্রেক্ষিতে বোঝা যায় হাজার রকমের ধর্ম থাকলেও আর মানুষ হাজারটা ভিন্ন উপায়ে সৃষ্টিকর্তার অন্বষণ করলেও মূল বিষয়টা একই। প্রথাগত বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে যে বিরোধ তা যেনো অনেকটা অন্ধের হাতি দেখার মতোঃ কেউ হয়তো হাতীর শুঁড় স্পর্শ করেছে, কেউ হয়তো হাতীর কান, আর কেউ হয়তোবা হাতীর পা- এই নিয়েই মতের পার্থক্য, যা কিনা বলা চলে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেতেই হচ্ছে। ইসলামিক Term এ বলা যায় সৃষ্টিজগতের যাকিছু ঘটছে তার সবই উসিলা(وسيلة) মাত্র। যারা বিভিন্ন ধর্মের fan বা follower তাদের খুব কমই সৃষ্টিকর্তার অন্বষণ করেছে, তারা ধর্মীয় পরিচয়ের সাথে নিজেদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। অনেকে আবার কোন একটা ধর্মীয় দলের দালাল(agent) হিসেবে কাজ করে যেক্ষেত্রে সত্য অনুসন্ধান করা তাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। একেকটা দলের দাবী তারাই সত্যিটা বলছে বাকিরা মিথ্যা/অসত্য ছড়াচ্ছে। ধর্ম নিয়ে আসলে যা করছে মানুষ তা আসলে আর কিছুই না অহং(egoic competition) এর প্রতিযোগিতা কিংবা mind game মাত্র।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 121