ভালো হইতে পয়সা না লাগলেও বুদ্ধি লাগে বটে!

বার্থার sprachcafé তে বসে গল্প করছিলাম। সাথে ছিলো সেই মরোক্কান ভদ্রমহিলা যার সাথে ঈদের জামাতে দেখা হয়েছিলো বাসার পাশের মসজিদে। সেই মহিলা পেশায় ছিলো একজন Goldsmith, বেশ বুদ্ধিমতী ও খোলা মনের। বলা চলে মিউনিখে আসার পর ওর সাথে প্রায় নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ হয়। ভদ্র মহিলা হিজাবী, বর্তমানে হিজাবী যারা তারা আসলে খোলাখুলিভাবে নিজেদের মুসলমান হিসেবে declare করার মানসিকতা রাখে; এতে আমি কোন দোষ দেখিনা এবং তাতে আমার কোন সমস্যাও নেই।( অন্যদিকে আমি হিজাব করিনা বলে অনেকেই আমাকে মুসলিম বলে মেনে নিতে পারেনা, মনে করে আমি সুবিধাবাদি মুসলিম। কিন্তু হিজাব পরে যেমন আমি নিজেকে খোলাখুলিভাবে মুসলিম বলে declare করিনা, তেমনি নিজের মুসলিম পরিচয়টা গোপনও করিনা। কারন মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে আমার যেমন কোন গর্ব(Pride) হয়না, তেমনি লজ্জাও(Shame) লাগেনা। হিজাব পরিনা বলে আমি যে মুসলিম তা শুরুতে অনুমান করতে না পারলেও মুসলিম ঘরানার বলে ও বেশ স্বাভাবিকভাবেই আমাকে গ্রহণ করে নিয়েছিলো। খালি একবার বলেছিলো-আমি যে মুসলিম তা দেখে বোঝা যায় না! তো কথা হচ্ছিলো আমাদের মধ্যে নানা বিষয়ে, কি নিয়ে কথায় কথায় এক প্রসঙ্গ আসলো- মানুষের মধ্যে ভালো ও মন্দ গুন নিয়ে। বার্থাকে ও বলছিলো খারাপ মানুষদের জন্য ভালো মানুষদের কি কি সমস্যায় পরতে হয় সে ব্যাপারে। তখন আমি বলে বসলাম বেশী ভালো যারা তাদের মধ্যেও সমস্যা আছে। অনেকে অনেক ভালো কাজ করে, সবার সাথে অনেক ভালো ব্যবহার করে কিন্তু অন্তরে বয়ে বেড়ায়(bitterness) তিক্ততা । যারা মুখে হাসি নিয়ে ঘুরে কিন্তু অন্তরটা বিষে ভরা তারা আসলে একেকটা ‘বিষে ভরা নাগিণ’! তখন সে ও হেসে বললো- বেশী ভালো হওয়া ভালো নয়, একটু কম ভালো হলেই হয়! আমি আরও বললাম- যারা নিজেদের ভালো বলে দেখা যায় তারাই আসলে সমস্যার মূল, এরা বেশীরভাগ সময়ই দুষ্টদের enable করে, তাদেরকে ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাবহারও করে এবং পরিশেষে গালমন্দ করে। সেক্ষেত্রে যারা নিজেদের দুষ্ট বলে ক্লেইম করে তারা অন্তত মুখোশধারী নয়। আমিতো নিজেকে ভালো বলে দাবী করতে পারিনা। তখন বার্থা বলে উঠলো- না না তুমি তো ভালো, কারন তুমি তো কাউকে খুন করোনি, কাউকে মারধর করোনা। তখন ওকে বললাম সবার মতোই আমার মধ্যেও ভালো ও মন্দ ৫০-৫০ আছে, তাই আমাকে আমি ভালো বলি কি করে?! তখন বার্থা বলে ওরকম হলে তো তুমি আর মানুষই থাকতে না, God হয়ে যেতে, একমাত্র God ই তো (perfect)নিখুঁত! আমি চুপ করে রইলাম; বুঝলাম ও আমাকে ভালো বলেই মেনে নিয়েছে তর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই। সে সময় এক কুর্দি মহিলা এসে আমাদের আড্ডায় যোগ দিলো। বার্থা আমাদের ঈদ কেমন কাটলো সে বিষয়ে শুরুতে যেমন জানতে চেয়েছিলো, ওর কাছেও জানতে চাইলো যে ও কিছু উদযাপন করে কিনা। ও জানালো সেভাবে উদযাপন করা হয়ে ওঠে না, দেশের বাড়িতে গেলে অবশ্যই উদযাপন করে ওর পরিবারের সাথে। ওই কুর্দি মহিলার সাথে আগেও দুই একবার কথা হলেও বেশী কথা বলার সুযোগ হয়নি। এইবার ওই মহিলার কাছে তার ধর্মের বিষয়ে জানতে চাইলাম। মহিলা জানালো ও ইয়াজিদি ধর্মের। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম- ও কি সেই এজিদ যে কিনা ইমাম হুসেইনকে হত্যা করেছিলো? মহিলা অস্বীকার করে জানালো কথা থিওরি যে প্রচলিত আছে এই নিয়ে! আমি মনে মনে ভাবলাম হয়তো আমার জানায় কোথাও ভুল আছে, এ বিষয়ে বেশী না জেনে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই! মহিলা বললো ওরা এক সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে, সূর্যের উপাসনা করে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি হিসেবেই (The sun is considered a manifestation of God’s light or glory, rather than a god itself.) আর Tawûsî Melek (‘Peacock Angel’) এ বিশ্বাস করে। ওই সময় মরোক্কান মহিলা বললো তোমরা তো শয়তানের উপাসনা করো, তাইনা? কুর্দি মহিলা বললো কিসব কথা মানুষ তাদের ব্যাপারে বলে অনেকটা ক্ষোভের সুরেই। তারপর বললো মুসলিমরা তাদের প্রতি কত জুলুম-অবিচার করেছে, কত মেয়ে বাচ্চা ও নারীদের কে তারা ধরে নিয়ে বাজারে তুলে টাকা নিয়ে বিক্রি করেছে! বুঝলাম মহিলার মনে মুসলিমদের প্রতি ভীষণ রকমের তিক্ততা। মজার ব্যাপার হলো এরকম আরও দুই চারজন কুর্দি মহিলার সাথে কথা বলে একই রকম অনুভূতি হয়েছে আমার, যে কুর্দিদের প্রতি মুসলিমরা সদয় আচরণ করেনি। আবার এমন মুসলিম মহিলাও দেখেছি যে কুর্দি হয়েও মুসলিম লোককে বিয়ে করেছে! প্রতিবেশী এক কুর্দি পরিবার আছে যারা ইরাকের কিন্তু তারা প্রতিবেশী আর এক ইরাকি মুসলিম পরিবারের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠই বলে মনে হয়েছে। বোঝা গেলো মুসলিম-কুর্দি কনফ্লিক্ট আছে, এখানে যেমন তিক্ততা আছে তেমনি আছে ভালোবাসার সম্পর্কও। কিছুটা খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারলাম কুর্দিদের নিজস্ব কোন দেশ নেই; মধ্যপ্রাচ্যের (middle east) ইরাক, ইরান, সিরিয়া, তুর্কি ও ইউরোপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সংখ্যালঘু হওয়ায় অনেক সময় অনেক রকমের রাজনৈতিক সহিংসতা ও হেনস্তার শিকার হয়েছে তারা। প্রসঙ্গ খানিকটা ঘুরে কথা উঠলো- ভালো ও মন্দ মুসলিম বিষয়ে। বার্থা বলছিলো- কত মুসলিম আছে যারা মন্দ কাজ করে, মানুষ হত্যা করে, মহিলাদের ধর্ষণ করে! সঙ্গে সংঙ্গে মরোক্কান সেই মহিলা প্রতিবাদ করে উঠলো- অসম্ভব যারা খারাপ কাজ করে, যারা মানুষ হত্যা করে, মহিলাদের ধর্ষণ করে তারা কখনোই মুসলিম হতে পারেনা! তখন আমি বললাম- এটা তো ভাই সব গ্রুপের জন্যই প্রযোজ্য, সব দলেই(group) তো ভালো-মন্দ আছে। ভালো বাংলাদেশী যেমন আছে, তেমনি তো খারাপ বাংলাদেশীও আছে। এমনকি পরিবারে এমন অনেক সদস্য আছে যাদের মোটেও ভালো মানুষ বলা যায় না! সব মুসলিম ভালো এই বিশ্বাস তো ঠিক হতে পারেনা! আমার দেশেও এমন অনেক মুসলিম আছে যারা অন্যায় কাজ করে। আবার ধরো অনেক ইহুদী তো আছে যারা অনেক ভালো কাজ করছে, কিন্তু মন্দ ইহুদীদের জন্য তাদের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে, বলা চলে তাদের জন্য আমরা সবাই কষ্টে পড়েছি। সেই মহিলা প্রতিবাদ করে উঠলো বারবার। মুসলিম কখনও খারাপ হতে পারেনা, এই তত্ত্বে তার তীব্র বিশ্বাস। সমস্যা হলো দুনিয়া তো তত্ত্বজ্ঞানে চলেনা। যে কোন তত্ত্ব ব্যবহারিক জীবনে এসে ব্যবহারকারীর রূপ ধারণ করে। ভালো খ্রিস্টান যেমন আছে মন্দ খ্রিস্টানও আছে বার্থা বলে উঠলো। কিন্তু মরোক্কান সেই মহিলা খারাপ কোন মুসলিম থাকতে পারে পৃথিবীতে সেই ধারণাটাই রাখতে চায় না মনে। কোন মুসলিম যদি খারাপ কিছু করে তাকে সে মুসলিম হিসেবে স্বীকার করেনা, disown করে। তখন আমি বললাম- আমি তোমার কাছে মুসলিম হিসেবে স্বীকৃত হয়েছি, এখন যদি আমি কাউকে হত্যা করি তাহলে তুমি কি আমাকে অস্বীকার করবে? মহিলা কোন উত্তর দেয়নি। আমি তখন মনে মনে চিন্তা করছিলাম, হ্যাঁ আমি খুব ভালো করেই জানি যতক্ষণ তোমার কাছে convenient হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার কাছে আমি মুসলিম বোন হিসেবে স্বীকৃতি পাবো। এর একটু এদিক সেদিক হলেই তুমি আমাকে আর চিনবেই না, শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই হচ্ছে মানুষের ধর্ম; এমনকি আমি নিজেও এর ঊর্ধে নই। আমরা আমাদের খারাপ দিকগুলো যেমন disown করতে চাই, তেমনি যাদের আমাদের কাছে খারাপ লাগে তাদেরকেও আমরা (reject)ত্যাজ্য করে দিতে চাই/দিই। ভালো মানুষের এই হলো স্বীমাবদ্ধতা, যা কিনা চিন্তার অপরিপক্বতাই ইঙ্গিত করে।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 103