“Sell your cleverness and buy bewilderment”

আমরা মানুষেরা এমন যে নিজেদের যার যার আদর্শের একটা মানদণ্ড নিয়ে ঘুরে ফিরি। সেই আদর্শের বাইরের যে কাউকে আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয় হোক সেটা বাহ্যিক রূপ, অর্থ, ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই মানদণ্ডে আমরা যখন অন্যদেরকে বিচার করি ঠিক তখন অন্যরাও একইভাবে তাদের আদর্শের মানদন্ডে আমাদের বিচার করে। এই বিচার প্রক্রিয়া জরুরী। কাদের সাথে আমরা চলবো, কাদের সাথে আমরা মিশবো এইরকম সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয় এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বভাবতই আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেরা ভালো থাকা। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত এমন মানুষের সংখ্যাও কম নেই যারা অন্যদের ভালো থাকাটা মেনে নিতে পারেনা। তাদের মধ্যে যে অশান্তি সেটা তারা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায়। বড় হতে হতে শিখেছি এমন অনেক মানুষ আছে যারা অন্যের মধ্যে বিভ্রান্তি ঢুকিয়ে দিতে চায় হোক সেটা তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, ক্ষমতা কিংবা বাহ্যিক রূপ নিয়ে। ইনিয়ে বিনিয়ে নানাভাবে যখন অনেকে বোঝাতে চায় তুমি কাম্য নও, তুমি সুন্দর নও, তুমি যথেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা রাখো না সেই প্রেক্ষিতে যারা নিজেকে ভালবাসতে শেখে সে এক স্বর্গীয় ব্যাপার বলে আমার কাছে মনে হয়। যারা নিজেকে ভালবাসতে পেরেছে তাদের সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিয়ে, তাদের প্রতি আমার বিশেষ ভালো লাগা কাজ করে, কারন এইসব মানুষগুলোই ভালোবাসা ছড়ায়ে যায়। অন্যদিকে যারা নিজেকে ভালবাসতে শিখেনি নিজের ভেতরের কমতিগুলোকে গ্রহণ করতে পারেনি তারাই আবর্জনা ছড়ায় চারপাশে। এক মহিলা অকপটে আমাকে বলছিলো অমুক ভাবী মোটেও সুন্দর না। সেই মহিলার মন্তব্য আমার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে মহিলাকে আরও ভালো করে বোঝার। মনে মনে ভাবতে থাকি সেই মহিলা কি নিজের কাছে নিজে সুন্দর?! এরপর এক মেয়ের সাথে দেখা হয় যে কিনা নিজের রূপ নিয়ে যথেষ্ঠ আত্নবিশ্বাসী, বোঝা যায় মেয়েটি নিজেকে ভালোবাসে, ব্যাস এইটুকুই মেয়েটির প্রতি এক ভালো লাগা তৈরি করে। যে মেয়েটিকে আমি তেমন চিনিনা সেই মেয়েটি যে নিজেকে ভালোবাসে এমনকি সেখানে যে কোন রকমের কপট বিনয় নেই সেটাও ভালো লাগে আমার। তো মেয়েটির বেশ প্রশংসা করে বসি। সেই সময় পাশের যতসব মহিলা প্রজাতি ছিলো তারা অনেকেই নানা প্রতিক্রিয়া জানানো শুরু করলো। এক মহিলা বললো আপনিও কি কম সুন্দর? আরেক মহিলা জানালো তার কাছে অমুক শ্যামা মেয়েটিকে বেশী ভালো লাগে। আরেকজন বলা শুরু করলো সবাই সুন্দর। কথা হচ্ছে সুন্দর, কম সুন্দর, বেশী সুন্দর এইসব কোন ব্যাপার না। কেউ যদি আমাকে সুন্দর না বলে তাহলে কি আমার মরে যাওয়া উচিত নাকি যাদেরকে মানুষ সুন্দর বলে তাদের প্রতি হিংসাত্নক, আক্রমনাত্নক, সমালোচনামুখর, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা উচিত। সবার কাছে সবাই সুন্দর হবেনা, যদি তাই হতো তাহলে চারপাশের এতো রকমের বৈচিত্র্য থাকতো না মোটেও। সৌন্দর্যের নানা রকমের মাপকাঠি আছে বলেই, নানা রঙয়ের-বর্ণের ফুল আছে বলেইনা পৃথিবীটা এতো মজার জায়গা। প্রাপ্ত বয়স্কদের কাউকে প্রশংসা করার সময় যদি অন্যদেরকে স্বান্তনাবাণী দিতে হয় সেখানে আমার সমস্যা আছে। আমি যাদের প্রশংসা করছিনা তার মানে তো এই না তাদেরকে গালমন্দ করছি। কারো প্রশংসা করলে অন্যদের খারাপ লাগার কারন কি আর স্বান্তনা দেবারই বা প্রয়োজন কেনো পড়ে? কারো প্রশংসা করছি সেই সময় ফর্সা মেয়ে সুন্দর নাকি শ্যামলা মেয়ে সুন্দর এই প্রসঙ্গ টেনে আনার কারন কি? কারন আর কিছুনা তারা আমার সাথে সহমত পোষণ করছে না। সহমত পোষণ না করাতেও অসুবিধা নেই। তবে এইসব মন্তব্যগুলো আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও চরিত্র পরিস্কার ভাবে ফুটিয়ে তোলে। আমরা সবাই চাই অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে, তাই কেউ যখন আমাদের প্রশংসা করে আমাদের খুব ভালো লাগে আর এর বিপরীত হলে আমাদের খুব খারাপ লাগে। কেউ যদি বলে আমার গোলাপ ফুল ভালো লাগে সেই সময় যদি কেউ বলে আমার কাছে গাঁদা ফুল বেশী ভালো লাগে তখন দুইজনই হয়তো সত্যিটাই বলছে। কিন্তু যদি রজনীগন্ধার গুণগান করি তখন নিশ্চয় জবা ফুল এসে বলবেনা শাপলা ফুল বেশী সুন্দর! সব ফুলই যদি সুন্দর হয় তাহলে কেউ কোন এক ফুলের প্রশংসা করলে নিতে পারেনা কেনো মানুষ?! নিতে পারেনা কারন জীবনটা তাদের কাছে অস্থির এক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, এখানে সবার ভেতরের কামনা pick me up, i am better! সবার মধ্যে প্রতিযোগিতা, প্রমাণ করার তীব্র চেষ্টা। আর এই সবই maskulin শক্তির বৈশিষ্ট্য- প্রতিযোগিতা, বস্তুগত গুণাগুণ দিয়ে বিচার করা, বিপরীতে faminine energy আমাদেরকে গ্রহণ করতে শেখায়, যে যেমনটা তাকে তেমনভাবেই মেনে নিতে, পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা না রেখে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থায় যেখানে সৌন্দর্যের আদর্শ মাপকাঠি আছে সেখানে মেয়েরা না হবে লম্বা-না হবে খাটো, না হবে মোটা-না হবে শুকনা, না হবে বেশী চালাক-না হবে অতি বোকা ইত্যাদি ইত্যাদি। হাজার বছরের সেই সামাজিক কাঠামোয় প্রতিযোগিতা প্রবণ মহিলা সমাজ তাই নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে আছে। এজন্য অনেক সময় দেখেছি অনেক মহিলা তার সামনে অন্য মহিলার প্রশংসা করলে একদম নিতে পারেনা, পুরাই প্রতিহত (defend) করতে শুরু করে। অনেক মহিলা অন্য মহিলার মাঝের কমতিগুলোই ফলাও করে প্রচার করতে থাকে! আগে বুঝতে কষ্ট হতো এমন আচরণ কেনো?! এখন যা বুঝি তা হলো এইসব ক্ষেত্রে মহিলারা তাদের feminine energy কে অস্বীকার করে masculine energy তে পরিচালিত যেজন্য তারা নিজেকে গ্রহণ করতে পারেনা, নিজেকে গ্রহণ করতে না শিখে তারা অন্যদের কাছ থেকে সেই validation খোঁজে প্রতিনিয়ত। নর-নারী সবার মাঝেই এই দুই শক্তি (feminine-masculine) সমানভাবে থাকে জন্মের সময়, সেই শক্তির ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সামাজিক প্রোগ্রামের মধ্যে দিয়ে। তাই যে feminine energy আমাদের পরিপূর্নতার উপলদ্ধি এনে দেয়, যে শক্তি সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে ও অন্যকে গ্রহণ করতে শেখায় সে শক্তিকে ছোট করে দেখে আমরা নিজেরাই নিজেদের কাছে ছোট হয়ে যাই। এরপর ঐ মহিলার কথার উত্তর দিতে চাই, হ্যাঁ আমি জানি যে আমি সুন্দর (অন্তত আমার কাছে আমি সুন্দর) বলেই অন্যের সৌন্দর্য আমাকে ইনসিকিওর করে তোলে না, আর সেজন্যই আমি সুন্দরকে সুন্দর (অন্তত আমার কাছে যা সুন্দর লাগে) বলতে কুণ্ঠাবোধ করিনা।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 103