Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

জুলাইয়ের পর শরিফুল হোক ডালিমের ইন্টারভিউ দেখলাম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি ইলিয়াস হোসেনের পরিচালনায়। ৪৯ বছর পরও এদের উল্লাস দেখে মনে হলো এরা যে কেবল পাকিস্তানপন্থী তাই নয়, এরা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রই চায়নি; তা যতই বাঙালী জাতির উপর পাকিস্তানি শাসকেরা অন্যায় অবিচার চালাক না কেনো। সেই স্বীকারোক্তিমূলক সাক্ষাতকার দেখার পর একে একে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ তথা পাকিপন্থীদের পক্ষের আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণ দেখলাম। পক্ষের বিপক্ষের বক্তব্য ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কাল থেকে আজকের ঘটনা প্রবাহ দেখে মনে হলো যে, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও এবং অধিকাংশের তাতে সম্মতি থাকলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের উগ্র অমানবিক দিক যখন প্রকাশ পেয়েছে ঠিক তখনই অনেকের বোধোদয় হয়েছিলো ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের সিদ্ধান্ত কত বড় ভুল ছিলো! যাদের আত্ন জাগরণ হয়নি তারাই আজও ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নেয় আর ভারতের বিরোধিতা করে। পরম যে সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়েছিলো তাহলোঃ ইতিহাসে সব সময় দুই পক্ষের লড়াই চলে- এক পক্ষ যদি শাসক হয় তবে অন্য পক্ষ হয় শোষিত। বঙবন্ধু শেখ মুজিব স্পষ্ট উচ্চারণে এই কথাই বলে গিয়েছেন, আর তাঁর এই বক্তব্যে এটাই বের হয়ে আসে যে তিনি ধর্মীয় সীমাবদ্ধতারও অনেক ঊর্দ্ধে উঠতে পেরেছিলেন। ব্যক্তিমানুষের মানসিকতা যদি কেবল ধর্মেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তাহলে তাঁর নেতৃত্ব হবে সংকীর্ণ পরিমণ্ডলে, সেখানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ একাত্ন হতে পারবেনা। বঙ্গবন্ধু এই সবকিছু ছাপিয়ে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে এক করতে পেরেছিলেন। আর তাঁর প্রতিষ্ঠিত সদ্য স্বাধীনপ্রাপ্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ ছিলো স্পষ্টভাবেই। যে বা যারা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র চায়নি তারাই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছে এবং সব সময় এক ধরণের আতংকে দিন কাটিয়েছে এই ভেবে যে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বাংলাদেশ কোনদিন বের হয়ে আসতে পারবে না কিংবা ভারত বাংলাদেশ দখল করে নিবে! বাংলাদেশের জন্মের শুরু থেকেই ভারতের প্রভাব ছিলো, আছে এবং থাকবেও। এই প্রভাবের ব্যাপারটা যে কেবল ভারতের তরফ থেকেই নির্ধারিত হবে তাও না, আমাদের পক্ষ থেকেও আমরা নির্ধারন করার সুযোগ বা সক্ষমতা রাখি বা negotiate করার অবস্থান আমাদের আছে! বাংলায় প্রবাদ আছে “গরিবের বউ সবার ভাবি”, আর এটি বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলোর জন্য তিক্ত হলেও সত্য। বাংলাদেশে কেবল ভারত না যত দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে তাদের সবাই মাতব্বরী ফলাতে চায়। এখন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল তা কিভাবে হ্যান্ডল করবে তার উপর নির্ভর করবে কে কতটুকু প্রভাব রাখবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা অন্যান্য সার্বিক বিষয়ে। গরীব হওয়ায় একদিক দিয়ে অনেক সুবিধাও পাওয়া যায় অনেক সময়, আবার অসুবিধাতেও পড়তে হয়। তবে এও সত্য বাংলাদেশের মতো ছোট এক দেশ হুট করে ধনী হয়ে যাক এটা সবাই চাইবে না। ভারত ফোবিয়ায় দেশের মানুষ যতটা ভোগে তার থেকে বেশী আতংকে থাকা উচিত চীন, রাশিয়া কিংবা পশ্চিমা দেশগুলো নিয়ে। এই দেশগুলো যত ভালো করার ক্ষমতা রাখে, মন্দ করার ক্ষমতা রাখে তার চেয়ে বেশী। এই দেশগুলো ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা অন্য ছোট ও গরীব দেশগুলো থেকে যেমন মেধা আমদানি করে তেমনি গরীব ও ছোট দেশগুলো থেকে কেবল profit আদায় ও সস্তা শ্রম কেনার সুযোগে থাকে। তেল, গ্যাস নিয়ে এদের নির্লজ্জ আচরণও বিশ্ববাসী দেখেছে/দেখছে। সেক্ষেত্রে ভারতকে অবিশ্বাস করে এইসব পরাশক্তিকে বিশ্বাস করা বোকামিরই শামিল, বরঞ্চ ভারতের সাথে মিলেমিশে থাকেলই অনেকদিক দিয়ে অনেক সুবিধা। ভারতীয় উপমাহদেশের দেশগুলো তথা এশিয়া কিংবা আফ্রিকার দেশগুলো যদি অখণ্ড শক্তি হিসেবে থাকতো তাহলে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো অসুবিধায় পড়ে যেতো। আর তাই এরা এইসব জায়গায় বিভাজন ও দীর্ঘমেয়াদী conflict বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে সব সময়। আজও এরা এশিয়া কিংবা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে শ্রম আমদানি করে, আবার একইসাথে সেইসব শ্রমিকদের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাবও পোষণ করে। কাজী নজরুল ইসলামের কুলি মজুর কবিতায় খুব সুন্দরভাবে ব্যাপারটা ফুটে উঠেছেঃ
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
বাংলাদেশের জনগণ এমনকি সেই সাথে রাজনৈতিক যে শক্তিগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে তাচ্ছিল্যজ্ঞান করে ও তাঁকে জাতির জনক হিসেবে অস্বীকৃতি জানায় তারা ভালো করেই জানে এক সময় ইতিহাসের পাতা থেকে তাদের সবার নাম মুছে গেলেও বঙ্গবন্ধুর নাম থেকে যাবে চির অক্ষয় হয়ে। তাঁর সেই স্থান আর কেউ নিতে পারবেনা। এই বিষয়ে যদি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এক হতে না পারে তাহলে দেশের ভেতর ঐক্য আসবেনা কোনোদিনও। যেমন পাকিস্তানের জাতির জনক মুহম্মদ আলী জিন্নাহ কিংবা মহাত্না গান্ধী ভারতের জাতির জনক, সেই বিষয়ে পাকিস্তান কিংবা ভারতের জনগণ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। অথচ বাংলাদেশের মানুষ আজও এই প্রশ্নে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। আর এতেই প্রকাশ হয়ে পড়ে একটি জাতির মধ্যকার অনৈক্য। বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক মেনে নিলেই যে তাঁকে পূজা করতে হবে কিংবা তাঁর ভুলত্রুটি গুলোর বৈধতা দেয়া হবে তাতো না, তাঁকে অসম্মান না করলেই হলো! অবাক হয়ে যাই যখন দেখি নতুন প্রজন্মের অনেকেই যারা ইতিহাস পড়ে দেখেনি কোনদিন তারাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কুৎসা ছড়ায়, তাঁকে অসম্মান করে মন্তব্য করে সোশ্যাল মিডিয়াতে! জাতি হিসেবে এ ধরণের আচরণ আমাদের সবার জন্য লজ্জার ও অবমাননাকর!