Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

একবার এক বৈঠকে আলাপ হচ্ছিলো বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে যা পরিচালনা করে এক জার্মানি ভদ্রমহিলা। সে বৈঠকে এক ইউক্রেনিয়ান মহিলাও ছিলেন যে কিনা কোন বেকারিতে Baker হিসেবে কাজ করে। সেই মহিলা রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে বলা শুরু করলেন সব রাজনীতিবিদ চোর-বাটপাট খারাপ লোক। এই কথায় মনে পড়ে গেলো আমার দেশের অধিকাংশ মানুষের কথা যারা এই কথাই বিশ্বাস করে! আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষ মনে করে রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তারা সবাই ধান্দাবাজ, কিন্তু বাস্তবতা এতোটা সরলও না। তখন ওই মহিলাকে আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম- ধরে নিলাম যে সবাই খারাপ, তাহলে ভালো লোকেরা রাজনীতিতে নেই কোন? ভালো লোকেরা যদি রাজনীতি না করে তাহলে কাউকে না কাউকে তো রাজনীতি করতেই হবে, নাহলে সব চলবে কি করে?! সেই মহিলা চুপ করে রইলো, কারন হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই, বা অতকিছু নিয়ে চিন্তা করার তার আজাইরা সময়ও নেই! বুঝলাম এইসব কথা মহিলার নিজস্ব নয়, আপামর জনতা আশপাশ থেকে ভেসে আসা কিছু কথা শুনে আর সেইগুলোই তোতাপাখির মতো কপচায়; যারা আসলে রাজনীতির বিন্দুমাত্র খবর রাখেনা। এক বান্ধবী হাসিনার আমলে শুনাচ্ছিলো যে হাসিনা ঠিকমতো দেশ চালাতে পারেনা, তখন আমি হেসে বলেছিলাম তাহলে এক কাজ করঃ তুই দেশ চালানোর দায়িত্বটা নিয়ে নে!
আমি তখন স্কুলে পড়ি, ক্লাশের কিছু মেয়ে খুব মোড়লগিরি করে সবকিছুতে, তারপর টিফিন ভাগবাটোয়ারা করার সময় ক্লাশের মেয়েদের সাথে ওদের ব্যবহার আমার কাছে আপত্তিজনক মনে হতো। এছাড়াও সব সময় কিছু এক্সট্রা টিফিন থাকতো বণ্টন শেষে ওরা যেগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে খেতো। এইসব দেখতাম আর মনেমনে ভাবতাম আমি ওদের জায়গায় থাকলে আরও সুন্দর করে টিফিন বণ্টন করতাম; আর বাড়তি টিফিনটুকু স্কুলে ফেরত দিতাম, নিজের উদরপূর্তি করতাম না! এইসব আদর্শবাদী চিন্তায় বেশ একটা ফুরফুরে অনুভুতিতে মনটা ভরে থাকতো। এরপর একদিন সেই সুযোগ এলো, দায়িত্ব পড়লো টিফিন বণ্টনের। মনে মনে খুশি ছিলাম প্রচণ্ড যে সময় এসেছে টিফিন কিভাবে বণ্টন করতে হয় সবাই জানবে! যথারীতি টিফিন বিলি হলো। মেয়েরা টিফিন নিয়ে যাচ্ছে, সবাইকে টিফিন দেয়ার পর দেখা গেলো সেই টিফিনের গামলায় আর কিছু অবশিষ্ট নেই! তো টিফিনের গামলায় সব সময় এক্সট্রা কিছু টিফিন থাকে, তারপরও নিজের ভাগ্যে কোন টিফিন জুটলো না! সবাই ব্যাপারটা না জানলেও কিছু মেয়ে জানলো, যারা আমার সাথেই ছিলো টিফিন বিলি করতে; যে আমি কিছু পাই নাই। ওরা সে সময় জানালো দুই একজন মেয়ে কয়েকবার করে টিফিন নিয়ে গেছে! টিফিন বিলি করার সময় নিজের ব্যার্থতার দায়ভার নিয়ে আমি সেদিন ব্যাপারটায় খুশিমনেই ছাড় দিই; কিন্তু এই এক ঘটনায় আমার নিজের বেশ শিক্ষা হয়ে যায়! যারা কোন একটা দায়িত্বে থাকে তাদের অবস্থা বুঝে ব্যাবস্থা নিতে হয়। সামান্য টিফিন বিলির সময় যদি মেয়েদের কাছ থেকে নূন্যতম নৈতিকতাবোধ আশা না করা যায়, তাহলে যারা টিফিন বিলির দায়িত্বে থাকে তাদের ব্যাবহার আর কতটা ভালো হবে মেয়েদের প্রতি! যারা টিফিন বিলি করতো তারা গণহারে সব মেয়েকেই অবিশ্বাস করে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে। বুঝলাম এই অনমনীয় আচরণ ও মোড়লের খোলস তাদেরকে সেইসব দুষ্টবুদ্ধির মেয়েদের থেকেই রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে! সেই ঘটনা আমার এখনো মনে হয় অনেক সময়। সেই ছোট্ট ঘটনার অভিজ্ঞতা এখনও অনেক বিষয় পর্যালোচনায় কাজে লাগে!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আদর্শবাদী ছিলেন। সারাজীবন সংসার নিয়ে তাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। বেগম মুজিব সাংসারিক সব নিপুণহাতে সামাল দিয়েছেন বলেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারতেন। অন্যদিকে তৎকালীন আওয়ামীলীগের যে জাতীয় চার নেতা(সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মনসুর আলী, আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান) ছিলেন দল পরিচালনায় তাদের ভূমিকা ছিলো অশেষ। কিংবা হয়তো আরও অনেক নাম না জানা, স্বীকৃতি না পাওয়া অনেক নেতা-কর্মী থেকে থাকবে যাদের ভূমিকায় আওয়ামীলীগ শক্ত অবস্থানে দাড়িয়েছিলো সে সময়। কিন্তু দেখা গেলো আদর্শবাদী মুজিব সেই ছোটবেলা থেকেই যার মন ছিলো দয়ার সাগর, সেই জনদরদী নেতা ৭৫ এ নৃশংসভাবে সপরিবারে খুন হয় সামরিক সেনাদের হাতে। শুধু তাই নয় সেই সাথে খুন হয় জেলবন্দী জাতীয় চার নেতাও(স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আদেশেই যারা জেলবন্দী ছিলেন)! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মনে হয় সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো অভিজ্ঞ নেতা-কর্মীদের দল থেকে সরিয়ে দেয়াটা! আদর্শ, আবেগ, অকুণ্ঠ ভালোবাসা দিয়ে দলের নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হলেও দল পরিচালনার জন্য দরকার পড়ে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করার লোক। সামনের সারিতে কাজ করবে এমন লোকের যেমন দরকার আছে দলে, তেমনি দরকার আছে সৎ ও কর্মঠ লোকের যারা নিপুণ হাতে সবকিছু পরিচালনা(এক্সিকিউট) করবে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি ভাষণে ও উপস্থিতিতে সারা দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছে মুজিব, পশ্চিমা নেতা ও বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছে মুজিব, জেল খেটেছে মুজিব, যত আলাপ-আলোচনার মধ্যমণি হয়েছিলো মুজিব। লাইম লাইটে সব সময় মুজিবই ছিলো, কিন্তু আড়ালে কাজ করে গেছে তারই সহধর্মীনী ও দলের নেতা-কর্মীরা। যুদ্ধে জয়ের পরের সময় পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেও তাতে তার ব্যার্থতা ছিলো। ব্যার্থতা ছিলো এজন্য মানুষকে সরল মনে বিশ্বাস করতো সে, মানুষের থেকেও ভালোটাই প্রত্যাশায় রাখতো! বাস্তবের পৃথিবীতে এমন উদার মনোভাব খুব একটা সুবিধা এনে দেয় না। পৃথিবীতে সবাই সমান, কিন্তু সেই পৃথিবীতেই নেই সবার এক স্থান!
উদাহরণস্বরূপঃ সরলা অনভিজ্ঞ কোন মেয়ে হয়তো বিশ্বস্ত ভদ্র কোন ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করে বিশ্বাস করে এমন কারও কাছে সবকিছু সঁপে দেয়, যে তাকে বাজারে বিক্রি করে দিতে দ্বিধা করবেনা। কাকে কতটুকু বিশ্বাস করতে হবে সেটাও চর্চার বিষয়। অন্ধ আবেগীয় বিশ্বাস আমাদেরকে চরম দুর্দশায় ঠেলে দিতে পারে!
একটা ব্যাপার আমি বিশ্বাস করি তাহলো মানুষ ভালো কিছু করার প্রেরণা থেকেই রাজনীতিতে নামে বেশীরভাগ সময়, খুব কমই আছে যারা খারাপ করার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে যোগ দেয়। যেকোন দল, বিশ্বাস বা আদর্শেরই হোক না কেনো তারা; ক্ষমতালোভী ও সুবিধাবাদী লোকজনেরা খুব একটা এই পথ মাড়ায় না। শুরুর দিকে মোটামুটি সবাই একটা আদর্শ ধারণ করে এই পথে এগোয়, এরপর সময়ের সাথে তাদের পরিবর্তন হয়। কেউ কেউ খুব সচেতনভাবে ভালো থাকার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত আর কেউ কেউ দীর্ঘ যাত্রাপথে একটু আধটু বিচ্যুতি মেনে নিয়ে আস্তে আস্তে দূর্নীতিতে (corruption) জড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন যদি এমন হতো আমি সবাইকে টিফিন বিলি করে নিজেই কোন টিফিন পাচ্ছিনা তাহলে আমার এক সময় মনে হতে পারে দুই একদিন এক্সট্রা টিফিন আমার পাওনা! আমার পারিশ্রমিক! কাজেই রাজনীতির সাথে যারা জড়িয়ে তাদেরকে আমি তাই মন্দ বলতে পারিনা। কারন দেখা গেছে পরোপকারী নিস্বার্থ লোকেরা যারা সর্বস্ব ত্যাগ করেছে, উপকার করেছে দেশ ও জনগণের তাদেরকেই এক সময় জনগণের রোষানলে পড়তে হয়েছে। মানুষের চরিত্র বড় অদ্ভুত! যে মানুষেরা একজনকে দেবতার আসনে বসায়, আবার সেই মানুষেরাই আরেক জনকে অসুর বানিয়ে বিতাড়ন করে/ফাঁসিতে ঝোলায়/আগুনে পোড়ায়/ ক্রুশবিদ্ধ করে/পাথর ছুড়ে হত্যা করে! মজার ব্যাপার হলো একই মানুষকে মানুষেরা অনেকসময় দেবতাজ্ঞান করে আবার তাকেই সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে অসুরজ্ঞান করে। কাজেই মানুষের সেন্টিমেন্টে চললে পড়ে কোন দলই সুবিধা করতে পারবেনা, যেটা কিনা রাজনীতির বর্তমান trend হয়ে দাড়িয়েছে; আর এটাই হয়তো গণতন্ত্রের বড় দূর্বলতা!