Ilussion

বাঙালী মুসলমানের বিভ্রান্তি!

সমস্যাটা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলাদেশের মানুষজন প্রকৃত মুসলমান হতে চেয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত পাকিস্তান আমলে যখন বাঙালীর সংস্কৃতি ও ধর্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাঙালী সংস্কৃতি ও ধর্ম পরিচয়কে হিন্দুয়ানী নাম দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধ শুরুই হয়েছিলো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে, একটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতির সাথে ধর্মীয় পরিচয় মিলিয়ে সে জাতির পরিচয়কে হিন্দুয়ানি নাম দিয়ে (ethnic cleansing) জাতিগতভাবে নির্মূল করার একটি সামরিক পরিকল্পনা। ধর্মের ভিত্তিতে জন্ম দেয়া সেই দেশ পাকিস্তান বাঙালী জাতিসত্তাকে নির্মূল করতে পারেনি, কিন্তু সেই ব্রিটিশদের মতোই এমন এক বীজ বুনে গেছে যে কারনে বাংলাদেশের মানুষেরা এখন পর্যন্ত নিজেদের প্রকৃত মুসলিম প্রমাণের জন্য মরিয়া।

হ্যারি পটার (Harry Potter) বইয়ে আমরা দেখি লর্ড ভোডেলমর্টকে(Lord Voldemort) যে নিজেই ছিলো half blood উইজার্ড সেই কিনা সব non-pure blood উইজার্ডদের নির্মূল করে দিতে চেয়েছিলো। এই পিওর ও নন-পিওর কমপ্লেক্স কেবল বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানের কমপ্লেক্স না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাস্যিদের উত্তরণই হয়েছিলো এই ধারণাকে (concept) কেন্দ্র করে। এমনকি সনাতন ধর্মের ইতিহাসেও এই কমপ্লেক্স ছিলো। হ্যারি-পটারের গল্প অনেকে সমালোচনায় উড়িয়ে দিলেও এটি আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে ছোটবেলা থেকেই। বইটি কল্পকাহিনী আকারে যেনো নগ্ন বাস্তবতাকেই তুলে ধরে আমাদের সামনে। যারা mudblood তাদের মধ্যেও যে magical power থাকতে পারে এই সত্যটা উঠে এসেছে এখানে। Hermione মেয়েটি mudblood হয়েও ম্যাজিকাল পাওয়ার ধারণ করতো, যা কিনা অনেকটা হিন্দু ধর্মের কায়স্থ/বৈষ্ণ/বৈশ্য শ্রেণীর হয়েও ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার মতোই ঘটনা। হ্যারি পটারের গল্পে একটি শ্বাশত সত্য উঠে এসেছে তাহলো যে বা যারা যখনই নিজেদের শুদ্ধ কিংবা উচ্চতর প্রমাণে তৎপর হয়েছে সেই মুহূর্তে তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। আরেকটি ব্যাপার খুব স্পষ্ট হয়ে প্রতীয়মান হয় এখানে যারা মানসিক ও চারিত্রিকভাবে দূর্বল তারাই অন্ধকারের অনুসরণকারী হয়। Peter Pettigrew হলো সেই প্রতীকী চরিত্র যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে চরিত্রটি ছিলো ভীরু(Coward), বেখাপ্পা (socially awkward) ও হীনমন্য (insecure)। এরকম চরিত্রের একটির উদাহরণ হলো- ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাইকে মিথ্যা ফাঁসিতে ফাঁসানো বদি চরিত্র, যে নিজের জীবন বাঁচাতে রাজসাক্ষী হয়েছিলো। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখি যাদের গঠনমূলক সমালোচনা বা রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করার ক্ষমতা/যোগ্যতা ছিলোনা তাদেরকে নেকড়ের মতো দলবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে। একজনের অস্তিত্ব কতটা বিশাল হলে তাকে এইভাবে হত্যার পরিকল্পনা করতে হয় সপরিবারে? একইভাবে রোমান সাম্রাজ্যের জেসাস ক্রাইস্টকে, নবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর দৌহিত্র শিয়া ইমামদের পূর্বপুরুষ ইমাম হোসেনকেও দেখা যায় নির্মমভাবে হত্যা করতে। মজার ব্যাপার হলো যারা এইসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের ইতিহাস শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেনা। ইতিহাস তাদের ঘৃণিত ও খলনায়ক হিসেবেই মনে রাখে! নিজেদের গণমানুষের উদ্ধারকারী ও ত্রানকর্তা হিসেবে দাবী করলেও আলোতে অন্ধকার ঠিকই বিলীন হয়ে যায়!

বাংলাদেশের মানুষ এখন হজ্জ করে, ডাবল হজ্জ করে দেশে ফিরে এসে দাবী করে তারাই প্রকৃত মুসলিম, অন্য কোন দেশের মানুষ তাদের মতো পাকা মুসলিম না। এর সাথে দাবী তোলে অন্য দেশের মানুষের সাথে তুলনায় পোশাক-আশাক, ধর্মীয় আচার-আচরণে বাংলাদেশীরা কত বেশী আন্তরিক! প্রকৃত মুসলিম হওয়ার পেছনে বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক বেশী চেষ্টা-তদবির করে। সহীহভাবে কুরআন পড়া, আরবি ভাষা শেখা, বেশী বেশী নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগী করা, দৈনন্দিন জীবনে ইসলামিক টার্ম ব্যাবহার করা, হিন্দুয়ানী ভাষা ও সংস্কৃতি বর্জন করা, আরবদের পোশাক পরিধান করা, মুসলিম ব্যাতিত অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব বর্জন করা, নিজেরদের ধর্মকে সবার সেরা দাবী করে অন্য ধর্ম নিয়ে হাসি-তামাশা করা, একইসাথে অন্য ধর্মের কেউ নিজ ধর্মের কিছু নিয়ে সমালোচনা করলে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদমুখর হওয়া, ইহুদী পণ্য বর্জন করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস শেয়ার করা, শিয়াদের মুসলিম হিসেবে স্বীকার না করা একইসাথে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে সমর্থন করা ইত্যাদি ইত্যাদি! এই যে বাংলাদেশীদের মধ্যে এতো বেশী অন্তর্দ্বন্দ্ব (contradiction) কাজ করে এর মূলেই কিন্তু প্রকৃত মুসলিম হওয়ার বাসনা এমনকি একইসাথে নিজেদের সবার থেকে সেরা প্রমাণের নেশা। একটু শিক্ষিত হয়ে এরা শিকড়কে অস্বীকার করে, পদ-পদবী ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। মানুষকে পরিমাপ করে পদ-পদবী ও শিক্ষাগত অর্জন দিয়ে। লর্ড ভোডেলমর্ট এর বাবা ছিলো একজন ধনী Muggle blood, যাকে তার মা ভালোবাসার ফাঁদে ফেলেছিলো কিন্তু ভোডেলমর্ট এর জন্মের পর যখন Love poton অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো তখন তার Muggle Blood বাবা তাদেরকে ত্যাগ করে চলে যায়। জন্মদাতা পিতার স্ত্রী-সন্তানকে ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় মননে ও আত্নমর্যাদায়(fragile ego) দূর্বল লর্ড ভোডেলমর্ট সংবেদনশীল(vulnerable) শৈশবকাল ঢাকতেই এক অনমনীয় খোলস(Persona)বেছে নেয় মূলত Muggle blood দের প্রতি পুষে রাখা ক্ষোভ(resentment) থেকে, যা পরবর্তীতে impure blooded উইজার্ডদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার আকাঙ্খা হিসেবে বেরিয়ে আসে। অন্যদিকে Peter Pettigrew ছিলো এমন এক চরিত্র যে বন্ধুদের দলে ছিলো সবচেয়ে কম প্রতিভাবান(least talented) একইসাথে ছিলোনা তার মধ্যে কোন মানসিক দৃঢ়তা(inner strength) ও সৎসাহস(moral courage) যেজন্য সে (James Potter)জেমস পটার,(Sirius Black)সিরিয়াস ব্ল্যাক ও (Remus Lupin) রেমোস লুপিনের দলে ভিড়েও তাদের সমকক্ষ না হওয়ার কারনে মনে মনে ক্ষুব্ধ(resentful) হয়ে উঠেছিলো। ক্ষমতাহীন Peter Pettigrew অনেকটা আজাইরা(Lame) উইজার্ড ছিলো বলেই অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাধর উইজার্ড লর্ড ভোডেলমর্টের ক্ষমতায় বিমোহিত হয় এবং ভবিষ্যতে এই উইজার্ডের উত্থানের ভয়ে তার পক্ষ নেয় আত্নরক্ষার তাগিদে। পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতে অখণ্ড ভারত থেকে আলাদা হয়ে আমেরিকার আশ্রয় নেয় Peter Pettigrew এর মতোই। নিজেদের কোন মৌলিক ভাষা ও সংস্কৃতি(ভারতীয় সংস্কৃতি অস্বীকার করায়) না থাকায়, উর্দু (আরবি হরফে হিন্দি ভাষা, আরবি শব্দের ব্যাপকহারে ব্যবহার) ভাষাভাষী পাকিস্তানিরা নিজেদেরকে মুসলিম ঘেঁষা(মিডল ইস্ট, আরব সংস্কৃতি) করায় তৎপর। এই পাকিস্তানই বাঙালী জাতিসত্তাকে অস্বীকার করতে চায়, মুছে দিতে চায় বাঙালীর আত্নপরিচয়। একাত্তরে অসফল হলেও পাকিস্তানের সেই চেষ্টা বিফলে যায়নি। ব্রিটিশদের মতোই পাকিস্তান এক সুপ্ত বীজ বপন করে গিয়েছিলো যা বেড়ে বর্তে আগাছার (weed) মতোই বিস্তার করেছে সারা বাংলাদেশে। পাকিস্তানের পথ ধরে বাঙালী জাতিসত্তাকে হিন্দুয়ানী বলে অস্বীকার করে বাঙালী যখন আত্নপরিচয় মুছে ফেলতে চায় তখন তারা শক্তভাবে ধর্মকে আঁকড়ে ধরে এবং নিজেদেরকে প্রকৃত মুসলিম প্রমাণে নেমে পড়ে প্রাণপণে। উঁচুজাতের হিন্দু না হলেও তো তারা প্রকৃত মুসলিম হতে পারবে এই আশায় শিকড় কেটে ফেলে গাছের মাথায় পানি ঢালছে বাঙালী মুসলিম। হাস্যকরভাবে এটা ঠিক জলে থেকে তৃষ্ণায় ছটফট করে মরার মতোই ব্যাপার। এ যেনো সুজলা-সুফলা, পানির দেশের মানুষের মরুভূমির রুক্ষ-শুষ্ক বালিতে স্বর্গ খুঁজে বেড়ানোর মতো ঘটনা; যেখানে মরুভূমির মানুষের স্বপ্নে সবুজ-শ্যামল, পানির ধারা বয়ে যাওয়া ভূমি স্বর্গ রূপে ধরা দেয়!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 139