রুপান্তর প্রক্রিয়া

alchemical transformation ->ego shedding->ego death->shadow self->integrated self->alignment with natural self->spiritual and psychological wholeness

রুমির সাথে প্রথম সাক্ষাতে শামস রুমির পণ্ডিতসুলভ অহংকারকে এক কঠিন পরীক্ষায় (চ্যালেঞ্জ) ফেলে দেয়। এক গাদা বইয়ের পাশে রুমি বসে ছিলো।

শামসঃ কি করছো তুমি?

রুমিঃ( অহংকারের সাথে) এমন কিছু যা তুমি বুঝবেনা!

এ কথা শুনে শামস রুমির বইগুলো পাশের একটা জলের বেসিনে ফেলে দিলো।

শামসের এরকম আচরণে রুমি রেগে গেলো। রুমির ছাত্ররা হায় হায় করে উঠলো যে তারা বই ছাড়া কি করে শিখবে! সবার এমন প্রতিক্রিয়ায় শামস একটা একটা করে বই পানির বেসিন থেকে তুলে নিলো, এবং আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেলো সবগুলো বই শুকনো, একদম ভেজেনি। বিস্ময়াভিভূত রুমি শামসের কাছ থেকে এঁর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে-

শামসঃ এমন কিছু যা কিনা পণ্ডিতের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়!

এরপর শামস সেই স্তূপীকৃত বইয়ের দিকে তাকিয়ে রুমিকে জিজ্ঞেস করলো-বইয়ের জ্ঞান তো অন্যের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা বা তথ্য ধার করে নিজের বলে চালিয়ে দেয়ার মতো ব্যাপার। বইয়ের বাইরে সে কি জানে? যা সে একান্ত নিজস্ব জ্ঞান হিসেবে দাবী করতে পারে?!

শামসের সাথে এই সাক্ষাতের মধ্যে দিয়ে রুমির তাসের প্রাসাদ ভেঙ্গে পড়লো(ego shedding) যেনো। শামস বুঝিয়ে দিলো মর্যাদা, প্রাতিষ্ঠানিক পদবীকে ঘিরে আমাদের যে অস্তিত্ব গড়ে ওঠে তার সবই ভুয়া ( false identity) যেটাকে বিলীন করে দিতে হয় এক সময় এতে করে আমাদের প্রকৃত সত্তা (true inner light) বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়!

প্রখ্যাত মনোবিদ কার্ল ইয়ুং একই কথা অন্যভাবে বলে গিয়েছেন, জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত আমাদেরকে শিখতে হয় সামাজিক আচার-ব্যাবহার, আদবকায়দা ও রীতি-নীতি; এসব কিছুরই দরকার আছে। কিন্তু এইসব social norm যদি সারাজীবন আঁকড়ে ধরে রাখে কেউ তাহলে তার সত্যিকার রূপান্তর হয় না, রুমির ভাষায় যে রূপান্তরকে বলা হয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লাভ(individuation)বা স্বতন্ত্রীকরণ। এই ব্যাপারটাকে সাহিত্যের ভাষায় অনেক জায়গায় alchemical transformation হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায়(alchemical transformation) উদাহরণ হিসেবে থাকে সীসার(Lead) স্বর্ণে(Gold)রূপান্তরের গল্প। কার্ল ইয়ং এর মতে ব্যাক্তির psychic death এর মধ্য দিয়ে অহংবোধের বিসর্জন (ego shedding) হয় যেখানে ব্যাক্তির অনমনীয় (rigid) ও পুরাণ পরিচয়, স্থানীয় সামাজিক ছদ্মবেশ ( localized social masks) ভেঙ্গে পড়ে বা বিলীন হয়ে যায়। এর ফলে ব্যাক্তির বিশাল ও ব্যাপক সত্তা আত্নপ্রকাশের সুযোগ পায়। এই সময় ব্যাক্তি তার shadow side গুলো যেগুলো সে সবসময় লুকিয়ে রেখেছে বা চেপে গিয়েছে সামাজিক স্বীকৃতির আশায় তা অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে আসে ব্যাক্তির সামনে। এই সময়টা বেশ নাজুক কারন ব্যাক্তি এ সময় নগ্নভাবে নিজের মুখোমুখি হয় যেখানে কোন মিথ্যা অজুহাত কাজে লাগে না। এই পথটুকু ব্যাক্তির জন্য খুব দূর্গম যেজন্য অভিজ্ঞ কারও সহায়তা নেয়ার পরামর্শ থাকে ক্লিনিক্যালি কিংবা আধ্যাত্নিক উভয়ক্ষেত্রেই যারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এই পথটুকু ঠিকঠাকভাবে পারি দিতে পারলে ব্যাক্তি আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিপূর্নতা(spiritual and psychological wholeness) লাভ করে। এই প্রক্রিয়াকে কার্ল ইয়ুং shadow integration হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং প্রক্রিয়ার পর যে রূপান্তরিত ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয় তাকে আখ্যা দিয়েছেন integrated self হিসেবে। shadow integration এর সময় ব্যক্তির ইগোকন্দ্রিক পরিচয় বিলীন হয়ে নতুন এক সত্তার জন্ম হয় যা ব্যক্তির প্রকৃত সত্তার সাথে মিলে যায় (alignment with natural self) এজন্য এই পুরো প্রক্রিয়াকে অনেক সময় পুনর্জন্ম হিসেব আখায়্যিত করা হয়। বিখ্যাত এক সুফি বাণী প্রচলিত আছে অনেকের মতে ইমাম আলী(রাঃ) এর বাণী এটি- “Die before you die” যার অর্থ দাড়ায়ঃ “মরার আগেই মরে যাও”। এখানে এই মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে অহংকার ও ক্ষুদ্র আমি-র বিসর্জন বোঝানো হয়েছে!

শামসের সাথে রুমির পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে রুমির সেই ego death’ই হয়েছিলো। যার ফলে আবির্ভাব হয়েছিলো মৌলিক সত্তার অধিকারী এক রুমির, যে আজও বেঁচে আছে তার মৌলিক সৃষ্টির মাধ্যমে ।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 139