ভালোবাসার নামে চলে প্রতিযোগিতাময় প্রদর্শন

মহামতি গৌতম বুদ্ধ বলেছেন মানুষের দুঃখ-দূর্দশার মূল কারন হলো অজ্ঞানতা। আমরা যারা দুঃখ এড়িয়ে যেতে চাই তারা মূলত দুঃখকে চাপা দিতে শিখি। দুঃখ দীর্ঘায়িত হয় যখন মানুষ দুঃখকে আঁকড়ে ধরে জীবনা যাপন চালিয়ে যায়। অন্যদিকে দুঃখকে যদি অস্বীকার করতে চায় মানুষ তখন সেটা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। এটা যে কেবল দুঃখের ক্ষেত্রে হয় তা না, বরং যেকোন অনাকাংখিত আবেগ-অনুভূতি আঁকড়ে ধরার প্রবণতা/দমনের ক্ষেত্রেই হয়। উদাহরণস্বরূপঃ স্বাভাবিক যৌন চাহিদা যে সমাজের মানুষ অবদমন করে যায় সে সমাজের মানুষের মধ্যে যৌনতা অনেক বেশী তীব্র ও বিকৃত হয়ে প্রকাশ পায়, যেটা কিনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটতে দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবে যখন মানুষ যৌন চাহিদা পূরণ করতে পারেনা তখন দেখা যায় যৌন বিষয়ে অবসেশন অনেক বেশী কাজ করে, যেজন্য গুগলের সার্চ রেজাল্টে শীর্ষে চলে আসে যৌন সুড়সুড়িমূলক কন্টেন্ট। দুঃখ-সুখ এই দুইই আমাদের জীবনে অবধারিত, আমরা যদি ক্রমাগত সুখের প্রত্যাশা করে যাই তাহলে তা হবে কেবলই অলীক কল্পনা, আর অলীক কল্পনা এক সময় না এক সময় ভেঙ্গে যাবেই। ভগবান শিবকে বলা হয় নীলকণ্ঠ। শিব চাইলে তো বিষ হজম করে ফেলতে পারতেন কিংবা অন্তত গিলে ফেলতে পারতেন। এখানেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য। আমাদের শেখানো হয় যেকোন তিক্ত অভিজ্ঞতা হজম করে ফেলতে কিংবা কোনভাবে গিলে ফেলতে মানে আরকি চেপে যেতে। কিন্তু শিব আমাদের দেখিয়ে দেয় যেকোন বিষাক্ত কিছু হজম করে বা চেপে না যেয়ে তাকে পর্যবেক্ষন করতে, সচেতনে তুলে ধরতে। আমাদের রাগ-ক্ষোভ, আমাদের দুঃখ-শোক, আমাদের আকাংখা-লোভ, আমাদের লজ্জা-অবমাননা সবকিছু। সচেতনভাবে যখন আমরা আমাদের ভেতরের নেতিবাচক চিন্তা ও আবেগগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করবো, বুঝতে চাইবো তখনই আমরা সেসব নেতিবাচক চিন্তার ঊর্দ্ধে উঠতে পারার সুযোগ পাবো। আবার বলতে হয় এই পর্যবেক্ষনের সময় সবাই যে নেতিবাচক চিন্তার ঊর্দ্ধে উঠতে চাইবে তাও নয়; এটা সম্পুর্ণই ব্যক্তিগত ব্যাপার ব্যাক্তি, কোন পথ(ঊর্দ্ধগামী কিংবা নিম্নগামী) বেছে নিতে চাইবে! মজার ব্যাপার হলো একই কথা অন্যভাবে বলে গিয়েছিলেন রুমি তাঁর এক অনবদ্য কবিতায়ঃ

This being human is a guest house.
Every morning a new arrival.

A joy, a depression, a meanness,
some momentary awareness comes
as an unexpected visitor.

Welcome and entertain them all!
Even if they’re a crowd of sorrows,
who violently sweep your house
empty of its furniture,
still, treat each guest honorably.
He may be clearing you out
for some new delight.

The dark thought, the shame, the malice,
meet them at the door laughing,
and invite them in.

Be grateful for whoever comes,
because each has been sent
as a guide from beyond. [Translated by Coleman Barks]

রুমির আরেকটি বিখ্যাত উক্তিঃ “The wound is the place where the light enters you.” জীবনে বেদনা, হতাশা, অস্বস্তি, অস্থিরতা, জ্বরা, মৃত্যু থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা যখন এই স্বাভাবিক বিষয়গুলো অস্বীকার করে যেতে চাই তখনই জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। পরিবর্তনশীল জীবনে পরিবর্তন মেনে না নেওয়ার কারনে আমাদের অবস্থা হয়ে যায় বদ্ধপানির ডোবার মতোই স্যাঁতস্যাঁতে, দূর্গন্ধময়, বদ্ধ। পরিবর্তনশীল সম্পর্ক, জীবনকে অপরিবর্তনীয় ধরে নিয়ে আমরা আঁকড়ে ধরতে চাই তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তিতে। এই ব্যাপারেই গৌতম বুদ্ধ সাবধান করে গিয়েছিলেন যে সাবধানবানী আমরা অনুধাবন করতে পারিনা সব সময়। যেজন্য দেখা যায় তীব্র আকাঙ্ক্ষা(craving) ও আসক্তি(attachment)কে আমরা প্রেম(love) বলে ভুল করে থাকি। ভালোবাসা যেখানে হওয়ার কথা মুক্ত আকাশে ওড়ার মতো অনুভূতি সেখানে বেশীরভাগক্ষেত্রেই দেখা যায় অভিজ্ঞতাটা পুরোপুরি উল্টো, অনেকটা সোনার খাঁচায় বন্দী পাখির মতো অবস্থা হয়। যেখানে আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি ও নিয়ন্ত্রণ কাজ করে সেখানে আর যাই হোক ভালোবাসা থাকেনা; ভালোবাসার নামে যা হয় তার সবই প্রদর্শন।

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 139