আজও ধর্মের নামে অধর্ম হয়!

সূফী কবি মাওলানা রুমির নাম আজ প্রায় সবাই জানে, অনেকে তাঁর নাম না জানলেও ওনার থেকে উদ্ধৃতি করে থাকে! এই রুমিও জীবনের কোন এক বাঁকে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে হেটেছিলো আর সে পথচলায় যে ছিলো দিক নির্দেশক তিনি হলেন শামস আল তাবরিজি। সে সময় রুমি ছিলেন ইসলামের বিরাট স্কলার ও শিক্ষক যার জ্ঞানের উপর বিশেষ দখল ছিলো, বইয়ে যিনি ডুবে থাকতেন এবং ছাত্রদেরকে তা থেকে শিক্ষা দিতেন। রুমি তাঁর ছাত্রদের পড়াচ্ছেন এমন সময় শামস আল তাবরিজির আগমন হয় সেখানে।

শামসঃ কে আল্লাহর নিকটবর্তী? যে স্বীকার করে তাকে কোনদিন পুরোপুরি জানা যাবেনা? নাকি যে শপথ করে দাবি জানায় তাকে সে খুঁজে পেয়েছে? এই সেই প্রশ্ন যা আমরা সবাই বয়ে বেড়াই। আমি কি আল্লাহর নিকতবর্তী? নাকি নিকতবর্তী হওয়ার ভাণ ধরছি কেবল?

এই প্রশ্নের কোন উত্তর রুমির জানা ছিলো না! যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে রুমি সব ছেড়েছুড়ে সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন।এক বর্ণনায় শোনা যায় শামসের এই প্রশ্নে রুমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। হুস ফিরে আসলে রুমির মধ্যে যে পরিবর্তন দেখা যায় তা ছিলো সবার অপ্রত্যাশিত। শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে, দৈনন্দিন কাজ বাদ দিয়ে শামসের সাথে অধ্যয়নে মগ্ন হয়ে যান।

শামস আল তাবরিজি জীবনভর সৃষ্টিকর্তার অন্বেষণ করেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন দিগ্বিদিক তাঁরই মতো আরেকজনকে খুঁজে পেতে যে সৃষ্টিকর্তার অন্বেষণ করেন। রুমির মধ্যেই তিনি তাঁকে খুঁজে পেলেন যেনো! দুনিয়ার সবকিছু ভুলে গিয়ে তারা একটি কক্ষে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিলেন, সৃষ্টিকর্তা নিয়ে তাঁরা দুজন গভীর আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়লেন। তাদের মধ্যেকার এই সাক্ষাতকারকে পরবর্তীতে লোকজন দুই মহাসাগরের মিলন বলেই আখ্যা দিয়েছিলো। কিন্তু আলো-আঁধারির দুনিয়ায় একান্ত নিভৃতে এই দুই জ্ঞানপিপাসুর আলাপচারিতার সৌন্দর্যটা সবাই ধরতে পারেনি। অনেকে এই বিষয়টা নিয়ে কুৎসা রটালো। রুমির ছাত্রদের মধ্যে গুজব রটলো যে আগন্তুক একজন তাদের প্রিয় শিক্ষককে নষ্টের দোরগোড়ায় নিয়ে গেছে। নানা কানাঘুষা থেকে জন্ম নিলো হুমকির। শেষমেশ শামস আল তাবরিজি কে বিদায় নিতে হলো। এই ঘটনার পর বিপর্যস্ত রুমি তাঁর বড় ছেলেকে অনুরোধ করলেন শামসকে ফিরিয়ে আনতে। রুমির জন্য শামস ফিরেছিলো বটে, সেখানকার লোকজনদের মধ্যে তখনও ঘৃণা বিরাজমান ছিলো তা বুঝেও। শামস রুমির বড় ছেলেকে জানিয়েছিলো যে এবার যখন সে চলে যাবে তখন সেই যাওয়াটা হবে তাঁর চিরকাল যাত্রা, যেখানে তাকে কেউ খুঁজেও পাবেনা! রাতের আঁধারে দরজায় একটা কড়া নড়েছিল, শামস দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়; এরপর আর কখনোই তাঁকে দেখা যায়নি। কোন চিৎকার, কোন সাক্ষ্য এমনকি কোন লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাঁর; ঠিক যেমনটি তিনি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন!

প্রশ্ন হলো কে শামস হত্যার অপরাধে জড়িত ছিলো? এমন এক জায়গায় শামসের লাশ খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে খুঁজে দেখার চিন্তা মানুষের মনে আসবেনা। রুমিরই বাড়ির পরিত্যাক্ত কুয়োতে শামসের লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো। এক বিবরণে জানা যায় রুমির ক্ষিপ্ত অনুসারীরা ও তাঁর ছোট ছেলে মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো! হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের অনুসন্ধান রুমি করেনি, এর বদলে তিনি এক অবাক কাজ করেছিলেন তাহলো তিনি তাঁর বাকি জীবনে হাজার হাজার কবিতা লিখে গিয়েছিলেন যেগুলোর সবকয়টির শেষে শামস তাবরিজির নাম স্বাক্ষর করা হয়েছিলো। শামস তাবরিজি ছিলেন রুমির আধ্যাত্নিক গুরু। শামস তাবরিজির সাথে দেখা নাহলে রুমির ভেতরের যে পরিবর্তন হয়েছিলো তা হয়তো কোনদিনই হতো না। আরবি ভাষায় শামস মানে হলো সূর্য। প্রায়শই রুমি রূপক অর্থে(metaphor) সূর্য শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তাঁর গুরুকে উদ্দেশ্য করে। শামসের মধ্যে রুমি সেই আগুন খুঁজে পেয়েছিলো যা তাঁর সমস্ত অহং ও বিভ্রম জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছিলো; অবশেষ যা ছিলো তা ছিলো সম্পূর্ণ রূপান্তরিত এক রুমি। শামসের সাথে রুমির সাক্ষাত ও তা থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতার বর্ণনা রুমি এমনভাবেই দিয়েছিলেনঃ ” I was raw, I was baked, I was burnt”

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 139