Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

প্রতিটি বিশ্বাসে এ কথাতে গিয়েই সবাই এক সময় একমত হয়েছে যে, মানুষের শরীরে ঈশ্বর বাস করে। কথা হলো ঈশ্বরই যদি মানুষের ভেতরে থাকে, তাহলে মানুষের এই করুন পরিণতি কেনো? বলা হয় মানব শরীরে ঈশ্বরের উপস্থিতি সব সময় থাকলেও মানুষ সেটা ভুলে থাকে; এই ভুলে যাওয়াটাই মানব জীবনযাত্রার এক অংশ। মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে থাকে তখন আসলে একটা পশু আর একজন মানুষের মধ্যে খুব একটা তফাত থাকেনা। পশু-পাখি যেমন ইন্দ্রিয়তাড়নায় চলে মানুষও একইভাবে জীবন নির্বাহ করে। খায়-দায়, ঘুমায়, বাচ্চা ফোটায়, টিকে থাকার লড়াইয়ে দূর্বলকে হারায়, সবলের থেকে পালিয়ে/তোষামোদ করে বেড়ায়, ফুর্তি-শোক করে এরপর এক সময় মরে যায়। এই যে পশুবৃত্তিক জীবনাচরণ এর থেকে যাদের উত্তরণ হয়েছিলো (নবী-রাসুল, মুনি-ঋষি) তারা চেষ্টা করেছে অন্যদের পথ দেখাতে। আমরা হয়তো অনেকে জানিনা নবী-রাসুল কিংবা মুনি-ঋষির মধ্যে পার্থক্য কি? মুনিরা ছিলেন তারাই যারা কিনা মৌনতা অবলম্বণ করতো এবং যোগ, আত্নবিশ্লেষণ ও মানসিক সংযমে সময় কাটাতো। অন্যদিকে ঋষিরা হলো তারা যারা গভীর ধ্যানের মাধ্যমে মহাজাগতিক সত্য সরাসরি উপলদ্ধি বা দর্শন লাভ করেছে এবং বৈদিক মন্ত্রে তা প্রকাশ করেছে। এদের মূল কাজ ছিলো বৈদিক শাস্ত্রের প্রচার, প্রসার এবং সমাজ পরিচালনার নিয়ম বা ধর্মীয় আইন তৈরি করা। নবী ও রাসুলের পার্থক্য আমরা যতদূর জেনে এসেছি তাহলো সকল রাসুলই নবী কিন্তু সকল নবী রাসুল নয়। রাসুলদের উপর কিতাব নাজিল হয়েছে, নবীদের উপর কোন কিতাব নাজিল হয়নি। অর্থাৎ কিনা রাসুলেরাও মহাজাগতিক সত্য উপলব্ধি করেছে এবং তা নতুন শরীয়ত, বিধান বা আসমানী কিতাবে প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে নবীদের উপর কোন বিধান নাযিল হয়না বরং তারা পূর্ববর্তী রাসুলদের দেয়া কিতাব ও বিধান(শরীয়ত) প্রচার ও রক্ষা করে।এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় যা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা আছে তাহলো পুরো মানব জাতির ত্রাণকর্তারুপে একজনের অস্তিত্ব স্বীকার করা, বাকিদের সবাইকে স্বীকার করলেও তাদের দেখানো পথ বাতিল বলে গণ্য করা। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি রাসুলকে তাঁর নিজ জাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি তাদেরকে স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেন (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৪)। রাসুলদের প্রত্যেককে প্রেরণ করা হয়েছিলো কোন একটা নির্দিষ্ট জাতির জন্য। কিছু ধর্মে ধারণা ছিলো ঈশ্বরজ্ঞান লাভের জন্য সংসার ত্যাগ করতে হবে, কিন্তু আব্রাহামীয় ধর্মে মুসা(সাঃ) কিংবা মুহাম্মদ(সাঃ) কে আমরা দেখি তারা সংসারধর্ম পালন করেও ধর্মপ্রচারে নিয়োজিত ছিলো। তাই ঈশ্বরজ্ঞান লাভের জন্য মানুষের সংসারত্যাগ করতেই হবে এমন কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই কোন। আবার যদি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী পর্যালোচনা করি তাহলে আমরা দেখি সে নিজেও ধ্যানে মগ্ন থেকে কিছু সময় অতিবাহিত করেছে এমনকি এই ধ্যানমগ্ন অবস্থাতেই সে নব্যুয়াতপ্রাপ্ত হয়েছিলো। ইসলামিক জ্ঞান যাদের আছে তাদের জানার কথা যে নবী-রাসুলেরা চারিত্রিকভাবে কতটা সংযমী ও উৎকর্ষতার অধিকারী ছিলো। তেমনি গভীর তপস্যা, সংযম এবং চারিত্রিক উৎকর্ষতার মাধ্যমেই মুনি-ঋষিরা পরম জ্ঞান লাভ করেছিলো। একেকটি রাসুল/ঋষি যদি একেকটি নদী হয় তাহলে এগুলোর সবগুলোই মহাসাগরে(one water body)গিয়ে মিলায় (যদিও মহাসাগরকে ভিন্ন ভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে পাঁচটি নামে চিহ্নিত করা হয়েছে) অর্থাৎ সেই পরমসৃষ্টিকর্তার দিকেই মানুষকে নিয়ে যায়।
প্রাতিষ্ঠানিক যে ধর্ম সেখানে আমরা দেখি মানুষ ধর্মীয় আচার-আচরণ ও রীতি-নীতি বেশ নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করে। পুরোহিত মন্দিরে পুজো দেয়, ইমাম নামায পরিচালনা করে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বেশীরভাগক্ষেত্রে এইসব আচার-আচরণেই আটকে থাকে, সত্যকার ধর্মপোলব্ধি এক্ষেত্রে হয়না; চারিত্রিক উৎকর্ষতার কথা নাহয় বাদই দিলাম! সত্যিকার ধর্মীয় উপলদ্ধি হলে ধর্মে-ধর্মে যে বিভেদ ও প্রতিযোগিতা সেটা আর থাকতো না। কোন একটি নির্দিষ্ট ধর্ম দাবী করে বসতো না যে একমাত্র এবং শুধুমাত্র আমাদের ধর্মই সেরা আর বাকিসব বাতিল ধর্ম। মজার ব্যাপার হলো- এই ব্যাপারটা কেবল ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়, জীবনের প্রায় সবক্ষেত্রেই বিদ্যমান। আমরা দেখতে পাই যেমন জিন্নাহ বলেছিলো ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’! ভিন্ন দল, সংস্কৃতি ও ভিন্ন মতবিশ্বাসের মানুষদের সাথে আমাদের আচরণই আসলে বলে আমরা ধর্মের পথে কতদূর এগিয়ে আছি! জিন্নাহ যদি কেবল বলতে পারতো উর্দু ও বাংলা উভয়েই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা তাহলে আজকে হয়তো পাকিস্তানের ইতিহাস অন্যরকম হতো। তবে জিন্নাহর ভাষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মের নাম করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম দিলেও সে আসলে অহমতাড়িত একজন মানুষ ছিলো, প্রকৃতভাবে যার ধর্মীয় উপলদ্ধি হয়নি। প্রকৃত ধর্মপোলদ্ধি হলে পরে এই দ্বৈতসত্তার বিলোপ ঘটে মানুষের, যার ফলস্বরুপ সমস্ত বিভেদ ভুলে গিয়ে তারা অন্য ধর্ম, বর্ন, মত, দল ও সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে শান্তিতে সহাবস্থান করতে পারে!