Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

মফস্বলের রাস্তা দিয়ে জিন্সের প্যান্ট পরে হাঁটলেই রাস্তাঘাটে মন্তব্য শুনতে হতো, মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপচাপ হেটে যেতাম। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগতো অনায়াসে প্যান্ট-শার্ট পরার অধিকার পুরুষেরা কি করে পায়?! এগুলোর সবই তো বিজাতীয় পশ্চিমা পোশাক। দেশীয় পোশাক পরা নিয়ে সমাজের যত মাথা ব্যাথা তা কেবল মেয়েদের বেলাতেই?! প্রথমে প্রথমে এই ব্যাপারটা নিয়ে মনে মনে রেগে গেলেও ব্যাপারটা আস্তে আস্তে বুঝতে পেরেছি। বিশ্বায়নের হাওয়ায় কিংবা বলা চলে ব্রিটিশদের পর আমেরিকার প্রভাবে মানুষ প্যান্ট-শার্ট, স্যুট-বুট অফিসিয়াল পোশাক হিসেবে গ্রহণ করলেও সার্বিকভাবে পশ্চিমা পোশাক মেনে নিতে পারেনি। এজন্য দেখা যেতো অফিস শেষে বাসায় এসে মোটামুটি সবাই লুঙ্গি ও ফতুয়া পরতো যা ছিলো আরামের পোশাক। এরপর উচ্চ পদবীর কলিগের কাছে শুনতে পাই বাসায় বউ তার লুঙ্গি পড়া নিষেধ করে দিয়েছে, বাসায় পরতে হবে পাজামা; কারন লুঙ্গি খ্যাত। উচ্চ পদবিতে যারা বহাল সেই সূত্র ধরে বউয়েরাও বেশ ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করে থাকে, এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক; ক্ষমতার চর্চা সেইবা করতে ছাড়বে কেনো?! ওদিকে মনে আছে মা-চাচীরা শাড়ি বাদ দিয়ে প্রথমে ম্যাক্সি পরা ধরলো যখন, তখন দেখেছি বাপ-চাচাদের তাতে মন থেকে সায় ছিলোনা (বিজাতীয় সংস্কৃতির ঘর পর্যন্ত অনুপ্রবেশ মেনে নিতে না পারার অক্ষমতাই হবে হয়তো)। কিন্তু মা-চাচিরা শাড়ি পরার শত ঝামেলা তুলে ধরে ম্যাক্সিই বেছে নিলো, এর পেছনে হয়তোবা আরও কারন আছে। শাড়ি যেমন তেমন, শাড়ির সাথে ব্লাউজ-পেটিকোট সব মিলিয়ে পড়াটাও বেশ খরচের ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তার থেকে ম্যাক্সিই সহজ ও সস্তায় মিলছে! ওদিকে অফিসে তারা ঠিকই শাড়ি পরে মাথায় ওড়না টেনেই যাতায়াত করতো; অর্থাৎ বাপ-চাচাদের বিপরীত রীতি তারা বানিয়ে নিলো, ঘরে পরিবর্তন বাইরে নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ! অথচ নানী-দাদীদের দেখতাম বাড়িতে ব্লাউজ-পেটিকোট ছাড়াই শাড়ি কিভাবে যেনো সুন্দর করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সংসারের সব কাজ করতে, মাথায় আঁচল তুলে নিয়ে অজু করে নামাজ পড়তে ! একমাত্র শীতের সময় ব্লাউজ-পেটিকোট, ছোট হাতা জাম্পার পরতে দেখেছি তাদের; যখন ঘর ও গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথাও গিয়েছে তখন অনেকে বড়জোর বোরকা চাপিয়ে নিয়েছে তার উপর, কিংবা বড় ওড়না বা আঁচল তুলে নিয়েছে মাথায়। ধর্ম ও আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে আস্তে আস্তে ব্লাউজ পেটিকোট পরার চল পাকাপোক্ত করা হয় মায়েদের আমলে। ছোটবেলায় দেখেছি যারা হাতাকাটা ব্লাউজ পরতো তাদেরকে মন্দ চোখেই দেখা হতো। থ্রি-কোয়ার্টার ব্লাউজ পরাকে শালীন(Modest) হিসেবে গণ্য করা হতো। আমাদের দেশে শালীনতার(Modesty) সংজ্ঞা আবার ব্যাক্তি বিশেষে radically ভিন্ন হয়ে থাকে কিনা। পশ্চিমা পোশাক থেকে একেবারে আরব বেদুইনদের পোশাকও এ দেশের মানুষের নিত্য অনুষঙ্গ! তাই মডেস্টির স্কেলটাও অনেক ব্যাপক! এক সময় see through হাতাওয়ালা ব্লাউজ পরতেও অস্বস্তি হতো, কারন খেয়াল করেছি হালকা revealing বা tight fit পোশাক পরা নিয়েও আশেপাশের মানুষের মধ্যে চলতো নানা ধরনের গুঞ্জন, কানাঘুষা। নায়িকাদের পোশাক নিয়েও মানুষজনের মন্তব্য শুনতাম, সিনেমা হলে শিষ দিতে দেখতাম; সেসব দেখে মনে হতো ওসব পোশাক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের পক্ষে বেমানান। ঘনিষ্ট এক বান্ধবী একবার জিজ্ঞেস করেছিলো মনে আছে- কেনো আমি পশ্চিমা পোশাক পরিনা, ওইসব পোশাকে আমাকে বেশ মানায়! উত্তরে ওকে আমি জানিয়েছিলাম ব্যাক্তিগত গাড়িতে করে ঘুরলে হয়তোবা পরতাম, পাবলিক পরিবহনে ওইসব পোশাক বেমানান। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে ‘ওই ছেড়ি! তোর বুকে ওড়না কই?’ এই সব নানা মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া, জায়গায় বেজায়গায় ঘেঁষে দেয়া লোকের তো অভাব নেই! তাছাড়া মনে মনে ভাবতাম রোম দেশে রোমানদের মতোই আচরণ করা উচিত, যদিও শার্ট-প্যান্ট, ফ্রক, স্কার্ট এসব পোশাকের কোনটাতেই আমার সমস্যা ছিলো না বরং পছন্দেরই ছিলো। যাই হোক আস্তে আস্তে ম্যাক্সি ছেড়ে মা-চাচিরা সালোয়ার-কামিজ ধরলো! এর পেছনের যুক্তি ছিলো ম্যাক্সির নীচটা একেবারে খোলামেলা, কারন অনেকে সাথে পাজামা বা প্যান্টই না পরে পেটিকোট পরে বলে। থ্রি-পিছ এক্ষেত্রে সবচেয়ে শালীন পোশাক। শালীনতার দোহাই দিয়ে এবারে সবাই থ্রি-পিছ ধরলো। ওদিকে মা-চাচিরা যখন থ্রি-পিছ ধরলো আমরাও একধাপ এগিয়ে প্যান্ট ও ফতুয়া পরা শুরু করলাম, আর ঘরে পরা শুরু করলো সবাই স্কার্ট-টপস বা স্ট্রেইট কাট পাজামা ও টি-শার্ট। অনেকটা যেনো মায়েদের সাথে তাল মিলিয়েই পরিবর্তনের হাওয়া এলো ঘরে ঘরে। আর ঠিক এর পরপরই শুরু হলো ব্যাপক আকারে হিজাব পরার চল, যেনো পরিবর্তনের ধকল সইতে না পেরে সবাই উলটোপথে হাটতে চাইছে জীবনের ঘোড়দৌড়ে কিছুটা লাগাম টানতে। বাইরে বেরুলে রোদ-ধুলো থেকে রক্ষা পেতে হিজাবের জুড়ি নেই, এতে করে ত্বক ও চুল ভালো থাকে ইত্যাদি নানা যুক্তি অনেকে তুলে ধরে। অনেকে এককাঠি সরেস হয়ে মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেয় (ভয়ে তাড়িত মন), হিজাব রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই বলে দাবী তোলে; অনেকে এও দাবি করে বসে মেয়েরা হিজাব ও পর্দা না করে চলার জন্য দুনিয়াতে যত আজাব-গজব নাজিল হচ্ছে! অনেকে বেকায়দায় পড়ে হিজাব না পরার অজুহাত দিতে শুরু করলো-মাথা গরম হয়ে যায়, মাথা-শরীর ঘেমে ভিজে গিয়ে বুকে ঠাণ্ডা বসে যায় বলে(এ অজুহাত দেয়ার ব্যাপারটা ব্যাপকহারে মধ্যপ্রাচ্যীয় সংস্কৃতিতে প্রভাবিত সময়ের ইঙ্গিত করে যেখানে হিজাব না পরার জন্য জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়, ক্ষেত্রবিশেষে social shaming এর শিকার হতে হয়; যা অনেক সময় moral policing এর পর্যায়ে পড়ে যায়)। মা-চাচিরা অনেকেই বোরকা বেছে নিলো তাতে নাকি সুবিধা, ঘরের পোশাকেই বাইরে চলে যাওয়া যায় কেবল বোরকাটা জড়িয়ে নিলেই হলো। এরপর সুন্নতি পোশাক নিয়ে মা-খালাদের মধ্যে তোরজোড় দেখলাম, সেক্ষেত্রে রাউন্ড কামিজে লম্বা ঘের থাকে। কামিজের দুই পাশে কাটা থাকলে পেট-কোমর দেখা যায়, যা কিনা অশালীন! মা ফাতেমা যেখানে উলঙ্গ অবস্থাতেও নামাজ আদায় করতেন নিজস্ব ঘরে নির্জনে, নানি-দাদিদের আমলে যেখানে ওড়না বা মাথায় আঁচল তুলে নিয়েই নামাজ হতো; সেখানে মা-খালারা সেলাই করা বাহারি লম্বা হিজাব পরা শুরু করলো। সেই হিজাবও খিমার নাম নিয়ে লম্বায় বাড়তে বাড়তে নেমে গেলো মাথা থেকে পা অবধি, সহীহ আকিদায় নামায পড়ার (সালাত কায়েম করার) দোহাই দিয়ে। ও হ্যাঁ এরই মধ্যে ছোটবেলায় শেখা নানা ধর্মীয় টার্মগুলোরও পরিবর্তন হতে দেখা যায়, উদাহরণস্বরূপঃ নামায হয়ে গেছে সালাত, সালাত থেকে আবার সলাত, একইভাবে রোজা>সিয়াম>সাওম ইত্যাদি ইত্যাদি। মজার ব্যাপার হলো এইসব পরিবর্তনে সবাই অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে, কারো মনে এই নিয়ে কোন প্রশ্ন জাগছে না (logic কিংবা anti-logic)। ফার্স্ট ফ্যাশনের যুগে ব্যাবসায়ীরাও নতুন নতুন ফন্দি আটে, ধর্ম ও আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে। নানী-দাদীর আমলে ব্লাউজ পেটিকোট না পরেও বিনা দ্বিধায় কাটিয়ে দেয়া জীবনে এতো জটিলতা ছিলোনা, তাদের উপস্থিতিতে এক ধরণের প্রশান্তির ছোঁয়া লেগে থাকতো, তাদের চিত্ত ছিলো এক ধরণের স্নিগ্ধ স্থিরতায় ভরা। পোশাক ও আচরণে এতো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মা-খালা-চাচীদের মনের দীনতা ও অস্থিরতাই যেনো ধরা পড়ে নগ্নভাবে। পরিবর্তনের স্রোতে তারা সবাই কেমন যেনো দিশেহারা, দিকহারা, উদভ্রান্ত, সে স্রোতে তারা প্রাণপণে বাঁধ দিতে চায় উল্টো পথে হেটে। এ যেনো অতি আধুনিকতা ও গতিশীল জীবনের বিপরীতে এক নীরব বিল্পব, যেনো উল্টো পথে হাটলেই সব ঠিক হয়ে যাবে! সারা জীবন যারা অধরা পুরস্কারের আশায় অন্ধের মতো দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো, তারাই যেনো আর দৌড়াতে না পেরে সবকিছু থামিয়ে দিতে চায় সেই মধ্যযুগে ফিরে গিয়ে। এজন্য আমরা দেখতে পাই এখনও মানুষ দৌড়াচ্ছে কিন্তু এই দৌড়টা উল্টোপথে, পশ্চিমা বিশ্বেও অনেকে নানী-দাদীর আমলে ফিরে গিয়ে সেই স্থিরতা খুঁজছে, অনেকে গৃহিণী জীবন বেছে নিচ্ছে স্বেচ্ছায়। অতি আধুনিক জীবনে এ ধরণের আচরণ আসলে এক ধরনের coping mechanism এর মতো, মানুষ দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠেছে, যারা স্বস্তি খোঁজে তারাই স্রোতের বিপরীতের পথ বেছে নিয়েছে। তবে এসবের কোনকিছুই স্থায়ী কোন সমাধানের কথা বলেনা, আর সেই সমাধানের পথ আমাদের কাছে এখনও অজানা!