Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

জাতীয়তাবাদ মানুষকে ছোট একটা ভূখণ্ডে যেমন আবদ্ধ করে ফেলে তেমনি ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ও মানুষকে একটি দলভুক্ত প্রাণীমাত্র করে তোলে। মানুষের পরিচয় তো আসলে এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। জার্মান যখন আসি তখন অনেককে দেখি বাংলাদেশ যে আলাদা এক দেশ তাই জানেনা; মনে করে ইন্ডিয়ার একটি অংশ। যখন দেখতাম বাংলাদেশ নামক একটা দেশ মানুষ চিনছে না তখন দেশের নামের সাথে ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করলে চিনতো! ছোট দেশ নিয়ে হীনমন্যতা না থাকলেও নিজেকে অবিভক্ত ভারতের অংশ ভাবতেই ভালো লাগে আমার কাছে! ধর্মীয় পরিচয়ে যখন নিজের পরিচয় দিইনি আগ বাড়িয়ে অনেকে ধরে নিতো ধর্মীয় পরিচয় লুকাচ্ছি বর্তমান বিশ্বে ইসলামোফোবিয়া বিরাজ করে বলে! অন্যদিকে মীডলইস্টের অনেকের মুসলিম বলে স্বীকার করতে কষ্ট হতো হিজাব/বোরকা পরিনা বলে, আরবি পারিনা বলে ধর্মীয় জ্ঞান নিয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করতো যেহেতু ধর্মীয় আচারও তেমন মেনে চলিনা বলে। সবকিছু বিবেচনা করে দেখা গেলো মধ্যপ্রাচ্য কিংবা পশ্চিমাবিশ্ব সবাই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তখন ইন্ডিয়ান কিছু বান্ধবীর পরামর্শ ছিলো লোকের কথায় পাত্তা না দিতে; ব্যাক্তিগত বিষয়ে মানুষকে এতো ব্যাখ্যাদানের কিছু নেই এটাই ছিলো তাদের মতামত। তখন ওদেরকে বলতাম আসলে তোমরা আমার জায়গায় নেই বলেই বুঝছো না, আমি নিজেই আসলে বুঝতে চাই কেনো আমি মুসলিমদের মতোও নই পুরোপুরি আবার মুসলিম হয়েছি কিভাবে এবং কেনো? কেনো আমি আরবদের জীবনধারা মেনে নিতে পারিনা! তখন ওরা জানিয়েছিলো হিন্দুদের মধ্যেও তো কত সমস্যা আছে। হিন্দুদের মধ্যে কি সমস্যা আছে সেটাও তো কম বেশী জানি; অনেকের মতো আবার ধর্ম থেকে পুরোপুরি বেরও হয়ে আসতে পারিনা! এইসব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি বলেই কিনা জানিনা নিজের পরিচয় দেয়ার সময় ধর্ম ও দেশের পরিচয় সচেতনভাবে এড়িয়ে যাই না। এর মানে এও না নিজেকে বাংলাদেশী বা মুসলিম পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারি।Structured বা organized religion গুলো আমাদেরকে বিভিন্ন সেক্ট এ ভাগ করে ফেলেছে, যেমন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞানকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করেছে। কিংবা আরেকভাবে বলা যায় সারা পৃথিবী একটাই মহাসাগরে ঘেরা কিন্তু মানুষ সুবিধার জন্য পাঁচটি অংশে ভাগ করে বিভিন্ন নাম দিয়েছে! এই নামকরনের ফলে হয়কি মানুষ ছোট একটা ক্ষেত্রে আবদ্ধ হয়ে যায়। এটা যেমন ভৌগলিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে হয় তেমনি হয় বাহ্যিক যেকোন কিছুর পরিচয়ের ক্ষেত্রেও! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হিন্দু পরিচয়ে এবং কাজী নজরুল ইসলামকে মুসলিম পরিচয়ে বেঁধে ফেলাও এক ধরণের সীমাবদ্ধ মানসিকতার লক্ষণ ইঙ্গিত করে। সীমাবদ্ধ পরিচয়ে সুখ খুঁজে নিতে চেয়েছি, কিন্তু তা কখনোই মানসিক প্রশান্তি (mental satisfaction) এনে দিতে পারেনি! মনের বিশাল জগতে সবকিছুই কেমন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই যুগে কে কোথায় আছে জানতে চাওয়া মানে পেশাগতভাবে কে কি কাজ করে সে অনুযায়ী তাকে মূল্যায়ন করা। যে যত বড় পদে নিযুক্ত সে তত বেশী সফল! যার যত বড় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আছে সে তত বেশী জ্ঞানী বলেই ধরে নেয়া হয়।
ঘরোয়া এক আয়োজনে এক মহিলা এসে পাশে বসে নিজের পরিচয় দিলো। কোথা থেকে পড়েছে, জার্মানিতে এসে কোথায় কোথায় পড়েছে, কোথায় চাকরিরত আছে বর্তমানে এইসব। মহিলা ড্রাইভিং পারে বলে অনেক দূরত্বের রাস্তাও তার হাতের নাগালেই আছে বলে মনে হয় এইসব নানা কথা! তাকে জানালাম জার্মানিতে আমারও একটা ডিগ্রি নেয়ার ইচ্ছে আছে কিন্তু নতুন করে কিছু শুরু করাটা পেইন লাগে; সেক্ষেত্রে তার মতো একজনের সাথে পরিচয় হওয়ায় অনুপ্রেরণা পাওয়া গেলো। মহিলা আমাকে পরক্ষনেই জিজ্ঞেস করলো আমি কোথা থেকে পড়েছি। মহিলা উত্তর শুনে বলে- আপনি তো অনেক ভালো জায়গা থেকে পড়েছেন, মহিলার কণ্ঠে ঝরে পড়লো প্রশংসা! এই সময়ে মনে পড়ে গেলো অভিভাবক মহলে ছেলে মেয়ে কেউ ভালো করলে যেমন উচ্ছ্বাস দেখা যায় সেরকম অনুভূতি। একইসাথে মনে পড়ে গেলো আহারে যদি ভালো জায়গা থেকে না পড়তাম, খারাপ কোন জায়গা থেকে পড়তাম তাহলেও কি মহিলার চেহারায় একইরকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেতো! জার্মান কোর্সে এক মহিলা ছিলো যে হচ্ছে ধুয়া-মোছার কাজ করে তার কথা মনে পড়ে গেলো। তাকে বেশিরভাগই এড়িয়ে চলতো! সে সময় মনে পড়তো হিন্দুদের ছোঁয়াছুঁয়ির বাতিকের কথা। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যারা সেই মহিলাকে এড়িয়ে চলতো তাদের মধ্যে যে ভয় কাজ করতো তাহলো আবার না তারাও সেই মহিলার পর্যায়ে নেমে যায়! আবার আমাদের যে শিক্ষক ছিলেন তিনি সেই মহিলার সাথে বেশ সাবলীল ও সহানুভূতিশীল আচরণই সব সময় করেছেন, আচরণে তফাত দেখিনি কখনও বরং অনেক সময় অনেক ব্যাপারে ব্যাপক ধৈর্য্যের পরিচয়ই তিনি দিয়েছেন। তখন সেই বাংলা প্রবাদ মনে পড়ে যায় – ‘উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, সেই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে’। তো সেই মহিলার মুখে প্রশংসা শুনে মনে হলো আহারে তিনি যে আমাকে কত বড় অপমান করলেন তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝছেন না! ডিগ্রির ভারে আমাকে মেপে উনি তো আমাকে সীমায় বেঁধে দিলেন, অথচ আমিতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তেমন কিছুই শিখিনি! বরং এমন একটা টাইটেল পেয়েছি যেটা ভীষণ সুবিধা দেয়, অনেকটা অস্ত্রের মতো কাজ করে! এমন একটা সময়ে আমরা এসেছি যেখানে এইসব পরিচয় জীবনের অনুষঙ্গ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। খুব সহজেই আমরা বিচার করে ফেলি কার সাথে মিশবো আর কার সাথে মিশবোনা! এক ভাবী অনুযোগ করে বলছিলেন তাদের সাথে আইটির লোকজন তেমন মেশেনা, আমি তখন উল্টো প্রশ্ন করেছিলাম আপনি কি Putzfrau এর সাথে মিশবেন? সেই ভাবী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়! সবারই তো আসলে পছন্দ-অপছন্দ আছে! এই যুগে সবাই যার যার bubble এ থাকতে পছন্দ করে! আমারও তো সবার সাথে মিশতে ভালো লাগেনা; যাদের সাথে মিশতে ভালো লাগে তারা তো আইটির লোকজন না(Coz they are so obvious)! যদিও আমার সার্কেলে আইটির লোকজনই বেশী! খুব বেশী ভালো না লাগলেও আসলে সবার সাথেই মিশি, কারন প্রতিটি মানুষ সবাই যার যার মতো করে অসাধারণ! কোর্স চলাকালীন সময়ে ধোয়ামোছা করতেন যে মহিলা তিনি আমাকে একবার তার সাথে ক্যাফেতে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। সে সময় তিনি আমাকে এক কাপ চা কিনে খাইয়েছিলেন, আমিও চেয়েছিলাম ওনাকে একবার চা-কফি কিছু একটা খাওয়াতে কিন্তু সে সুযোগ আমি পাইনি! যে মহিলার মাথা গোঁজার ঠাই নেই (Wohnunglos), অতি অল্প মাইনের কাজ করে সেই কিনা আমাকে ঋণী করে রেখেছে! অবশ্য কিছু কিছু মানুষের কাছে ঋণী থাকতেও খারাপ লাগেনা!