মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে, আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।

মানুষের কথা আর কাজ সব সময় এক হয়না, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এমন। যেমন এক সময় এমনও গেছে যে মুখে বলেছি- আমি গৃহিণী জীবন চাই না, ক্যারিয়ার গড়ব, কিছু একটা হবো। কিন্তু যখন ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপার আসে তখন দেখা যায় কোনকিছুতে আগ্রহ খুঁজে পাইনা, ভেতর থেকে কোন চেষ্টা আসেনা। আমার মায়ের কিংবা বাবার দিকের মোটামুটি সব আত্নীয়ার ক্যারিয়ার আছে, এই নিয়ে পরিবারের সবার মাঝে একটা গর্ব কাজ করতো। আমার মার কাছে গৃহিণী মহিলা বলতেই অলস অকেজো বলেই আমার মনে হয়েছে। মনে পড়ে ছোটবেলায় মার হাতে বোনা বাবার জন্য পুলওভার, মাফলার দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, মায়ের হাতে বোনা তার নিজের জন্য একটি রঙিন চাদর, টেবিল ক্লথে তার হাতে বোনা নকশা দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম; মনে মনে আউড়েছিলাম যে আমিও এক সময় ওরকম উল বুনে কিছু একটা বানাবো, সুই সুতোয় নকশা তুলবো! তখন বয়স আর কত হবে, ৬ বছর হবে হয়তো। ততদিনে আমার মা সংসার-সন্তান-চাকরি সামলাতেই ব্যাস্ত, ওইসব শখ তার শিকেয় তুলে রেখেছে। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কেনো আর উল বোনেনা? সে কেনো আর সুই-সুতোয় নকশা তুলে না? মনে আছে মার উত্তর ছিলো ওইগুলা আজাইরা কাজের সময় তার নাই। তখন বুঝিনি আজাইরা কাজ কেনো ছিলো সেগুলো, আর কেনোইবা সে কোনদিন আমাদেরকে উল বোনা কিংবা নকশা করা শেখায় নাই। এখন বুঝি কেনো ঐগুলা আজাইরা কাজ ছিলো, ওই শখের কাজগুলোর বাজারমূল্য কম, মাথা খাটানোর কাজ মূলত পুরুষ শক্তি( masculine energy) কেন্দ্রিক যে কাজ, যে কাজে পয়সা আসে সেই কাজের মূল্য অনেক। যারা ক্রিয়েটিভ কাজ করে তাদের সামাজিক মর্যাদা আর যারা চাকরি-ব্যাবসা করে তাদের মর্যাদা এক না। মানে আরকি যার যত পয়সা তার তত দাম। ক্রিয়েটিভ কাজে পয়সা নেই, নিরাপত্তা নেই, সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তাও নেই; অন্যদিকে চাকরিতে নির্ধারিত বেতন আছে, নিরাপত্তা আছে, সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা আছে এমনকি অবসরকালীন পেনশনের ব্যাবস্থাও আছে। মনে আছে মা গর্ব করে বলতো তার কোন চিন্তা নেই, কারন সরকারি চাকরিতে যারা আছে তারা হলো গিয়ে হাতির মতো, বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা। মায়ের আত্নবিশ্বাস আর ওইরকম কথায় হাসাহাসি করলেও মনে মনে হিসেব কষে নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত বলেই মনে করতাম, কারন মা মরলেও যদি লাখ টাকা আসে তাহলে তো আর নিজের কিছু করা লাগবেনা, ওই টাকা দিয়েই বড় হয়ে অনেক কিছু করা যাবে বা বসে বসে খাওয়া যাবে!

তখনো ছোট বাংলা সিনেমাই দেখি, কত লেখক, কত গায়ক, কত বাঁশি বাদক, কত শিল্পী অর্থাৎ সৃষ্টিশীল কাজের সাথে জড়িত যারা তাদের কেউই ভাত পায়না, অভুক্ত থাকে। কবি কবিতা লিখে সে কবিতা অন্যকে দেখানোর জন্য মানুষের পিছে পিছে ঘুরে, তাদের বেশিরভাগ কবিতাই অখাদ্য, মানুষ তা নিয়ে হাসাহাসি করে; কবিদের আতেল আখ্যা দিয়ে সবাই যার যার গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের জীবনী পড়ি আর মনে মনে হিসাব করি জমিদারের পুত্র বলেই তার পক্ষে সৃজনশীল পথ বেছে নেয়া সহজ হয়েছিলো, তার উপর সে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একজন প্রতিনিধি। বিপরীতে কাজী নজরুল ইসলামের দিকে যখন তাকিয়েছি তখন মনে হয়েছিলো আরে গরীব ধনী কোন ব্যাপার না, ব্যাপার হলো লিঙ্গ পরিচয়। একজন মেয়ে হয়ে কাজী নজরুলের জীবন বেছে নেয়া সম্ভব না। মহিলা বাউলদের দেখে অবশ্য ভালো লেগেছিলো, কি সুন্দর একতারা হাতে নিয়ে তারা কত জায়গায় ঘুরে বেড়াতো, সংসার জীবনে নিজেদের বন্দী না করেই। মনে আছে কি হতে চাই জিজ্ঞেস করা হলে বলেছিলাম যে আমি বাউল হতে চাই। কিন্তু ওই বাংলা সিনেমা সব মেরে দিয়েছে, সেখানে বাউলদের জীবনও এমনভাবে দেখিয়েছে যারা ওই পথে নেমেছে তারা নিজেরা তো না খেয়ে মরেছেই তাদের সাথে যারা জড়িয়ে ছিলো তাদের পরিবারও না খেয়ে মরেছে। সৃজনশীল পথ নিয়ে কি এক বিভীষিকাময় জীবন আঁকা হয়েছিলো আমাদের চারপাশে! কেনো আঁকা হয়েছিলো? এ প্রশ্নের উত্তর অনেকদিন ধরে খুঁজেছি, সে উত্তরও পেয়েছি। আধুনিক জীবন ব্যবস্থা মানুষের সৃজনশীলতার বিপরীতেই কাজ করে যাচ্ছে, যারা সিস্টেম অন্ধভাবে অনুসরণ করছে তারাই অধঃপতনে গিয়েছে, হয়েছে সিস্টেমের দাস। এজন্য আজকাল দেখা যায় সবাই ছুটছে, কেনো ছুটছে কেউ জানেনা! তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় আর তাহলো সবাই ভয়ে ছুটছে। এই ভয় তাদের তাড়া করছে যে, যদি তারা না ছুটে চলে তাহলে পিছিয়ে পড়বে, আর পিছিয়ে পড়া মানেই হার মেনে নেওয়া, হার মেনে নেয়া মানে মৃত্যুকে বরন করে মতো। এসবই আসলে অহম কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ, আগে লোভ দেখাওঃ আরামদায়ক জীবন, জাকজমকপূর্ণ জীবন, অফুরন্ত আনন্দের জীবনের হাতছানি ; লোভে কাজ না হলে ভয় দেখাওঃ দুর্বিসহ যন্ত্রণাদায়ক জীবনের ভয়, সামাজিকভাবে অগ্রহণীয় হওয়ার ভয়, না খেয়ে মরার ভয়; যার সবই survival লেভেলে ঘটে থাকে। অথচ সৃষ্টিশীলতা মানুষকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায় যেখানে মানুষ ভয়ে বাঁচে না। যখন মানুষকে ভয় এবং লোভ তাড়া না করে তখন তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। কিন্তু বর্তমানে পরিবার থেকে সমাজের সর্বক্ষেত্রে দেখা যায় সব মানুষেরা নিয়ন্ত্রণকামী। চিন্তায় মননে স্থবির যারা তারা সৃষ্টিশীলতাকে ভয় করে, কারন সৃষ্টিশীল স্বত্বাকে (ভয় কিংবা লোভ দেখিয়ে) নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সৃষ্টিশীল লোকদের জীবনে বস্তু লক্ষ্য নয়, সৃজনশীলতায় তারা জীবনের মানে খুঁজে পায়, আনন্দে ভাসে। এজন্য দেখা বর্তমান সিস্টেমে যারা সৃষ্টিশীলস্বত্বা তাদের ভোগান্তি(suffering) খুব বেশী, কারন এই পুঁজিবাদী সামাজিক কাঠামোতে যেখানে সবকিছুর মূল্য অর্থ দিয়ে নির্ধারিত হয় সেখানে তারা নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেনা। এজন্য রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে বেজে উঠে ” সুখ যারে কয় সকল জনে বাজাই তারে ক্ষণে ক্ষণে– গভীর সুরে “চাই নে’ “চাই নে’ বাজে অবিশ্রাম॥ যদি জানতেম আমার কিসের ব্যাথা তোমায় জানাতেম…।” পুঁজিবাদী সমাজ ব্যাবস্থা মানুষের জীবনে নিশ্চয়তা এনে দিয়েছে কিন্তু প্রতিদানে তাদের জীবনের সুখ কেড়ে নিয়েছে। বস্তু দিয়ে আমরা আমাদের শূন্যতা ভরিয়ে তুলে চলেছি, কিন্তু এই শূন্যতা এক আজব শূন্যতা; যতই আমরা জমা (accumulate) করি ততই যেনো কি এক বিষণ্ণতা, বিশাল এক শূন্যতা আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলছে। এ সময় আমরা খুব শক্ত করে ধর্ম আঁকড়ে ধরি, কিন্তু ধর্মীয় চেতনা আমাদের মননে সাময়িক সান্ত্বনার মতোই কাজ করে, কারন ধর্ম বলে যা আমরা আঁকড়ে ধরি সেটাও আসলে পুঁজিবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ছাড়া কিছু নয়। প্রকৃত ধর্ম সামাজিক ধর্মাচার থেকে অনেক দূরের বিষয় যা বুঝতে হলে পুরো সিস্টেমকে বুঝতে হবে, বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাবস্থা বুঝতে হবে, এজন্য ধর্ম খুব কম মানুষের উপলব্ধিতেই ধরা দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক সব ধর্মীয় ব্যাবস্থাই আসলে পুঁজিবাদী সিস্টেমের হস্তক্ষেপে এক একটি ধর্মীয় যন্ত্রকল হয়ে উঠেছে যাদের সবার দাবি তাদের তৈরি করা ফর্মুলাই সবার সেরা! তারপরও আশার বিষয় মানুষ চাইলে তা যে কোন ধর্মেরই হোক না কেনো এই ব্যাপারটা বুঝতে পারবে যদি তারা তাদের ধর্মগুলো ভয়ে তাড়িত না হয়ে বোঝার উদ্দেশ্যে পড়াশুনা (study) করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো পুঁজিবাদী সমাজ ব্যাবস্থা সমস্ত ধর্মীয় ব্যাবস্থাও তুলে দিতে চায়, কারন মানুষের মধ্যে থেকে ধর্মীয় বিশ্বাসও যদি তুলে দেয়া যায় তাহলেই তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়া যায়। এই করে করে এমন এক অবস্থায় এসেছে আজকের সমাজ ব্যাবস্থা যেখানে মানুষের মধ্যে কোন পারিবারিক মূল্যবোধ নেই, ধর্মীয় মূল্যবোধ নেই, সামাজিক মূল্যবোধও নেই। মানুষ এখন ম্যাটেরিয়ালিস্টিক, ইনডিভিজুয়ালিস্টিক; একরাশ বস্তুগত সম্পদের পাহাড়ের পাশে সে বড় একা, অর্থহীন জড় এক অস্তিত্ব যেনো। এই সন্ধিক্ষণে (পয়েন্টে) এসে মানুষ আজ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তারা এখন সৃষ্টিশীল সত্ত্বার খোঁজ করছে, জীবনের মানে চাচ্ছে। বস্তুগত সম্পদ সব জড়ো করে তারা নিজেদের জিজ্ঞেস করছে- এই কি সুখ? এই যদি সুখ হয় তাহলে হাহাকার করা শূন্যতা কেনো ঘিরে রাখে তাদের। সৃষ্টিশীল সত্ত্বার লালনে তারা তাদের ভিতরের নিজস্বতাকে জাগিয়ে তুলছে, যেখানে তাদের প্রাণ ভোমরা লুকিয়ে থাকে সেই প্রাণ ভোমড়ার গুনগুনানি তারা কান পেতে শুনছে। যখন এই প্রাণ ভোমরা জেগে উঠে তখন আমরা কি হয়েছি বা কি হতে পারিনি সেটা মূল বিষয় হয়ে দাড়ায় না, মূল বিষয় হয়ে দাড়ায় বেঁচে থাকার আনন্দ। বেঁচে থাকাই যখন উদযাপনের কারন হয়ে ওঠে তখন আর বস্তুগত বিষয়গুলো বড় হয়ে দাড়ায় না। তখন আমরা হিসাব কষিনা আমাদের কি আছে বা কি নেই? কেউ আমাদের সে স্বর্গসুখ কোনকিছু দিয়ে কেড়ে নিতে পারেনা, কিছুতেই না!

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 91