ধর্মের নামে সব চলে!

ধর্ম নিয়ে প্রতিযোগিতা কিংবা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি আমাদের অহমিকার সূত্র ধরেই উদিত হয়। যারা ধর্ম প্রচার করে গেছেন, ধর্ম প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তারা যেখানে বলে গেছেন তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না, প্রতিযোগিতা করবেনা; সেখানে আমরা যারা ধর্ম অনুসরণকারী তারা বেশীরভাগ সময়ই ধর্ম নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে যাই। কার ধর্ম সবচেয়ে সেরা, কার ধর্ম সবার অনুসরণ করা উচিত, কার ধর্ম একমাত্র সঠিক পথের সন্ধান দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি বলে নিজের ধর্মকে সবার ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাই। ধর্ম কি সেটাই যেখানে আমাদের বোধের বাইরে, সেখানে আমরা উঠেপড়ে লেগে যাই কার ধর্ম সেরা আর কার ধর্ম হাস্যকর সেটা প্রমাণে। যেখানে প্রমাণের প্রশ্ন চলে আসে সেটা আর যাই হোক, ধর্ম নয়। ধর্ম অনুধাবনের বিষয়, অন্তরের গভীরের উপলদ্ধি; আমাদের চিন্তা ও কাজের মাধ্যমে যা প্রকাশ পায় সেটাই মানুষের ধর্ম। ভালো মানুষ বলে নিজেকে দাবী করতে পারি, কিন্তু দেখা গেলো যখন চিন্তা করি তখন যতসব আজেবাজে চিন্তা করি, কে কত বড় জোচ্চোর, কে কত বড় বাটপার, কে কত বড় দুশ্চরিত্রা ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন কথা বলি তখন কে কয়টা গাড়ি কিনলো, কার কয়টা প্রেম আছে, কোন ধর্মের লোকজন একেবারেই বেকুবের মতো সাপ, গরু, বটগাছের পুজো দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন কাজ করি তখন কি করে অনেক টাকার মালিক হবো, কি করে অন্যকে হারিয়ে নিজে জিতে যাবো, কি করে অন্যকে বোকা বানিয়ে নিজে লাভবান হবো ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা যায় যারা নিজেকে ভালো মানুষ বলে দাবী করে, মুখে ধর্মের কথা আওড়ায়, অন্যদের ধর্ম শিক্ষা দেয়, এমনকি পোশাকে-আসাকে যাদেরকে দেখে সবার মনে হতে পারে তারা অতি ভালো মানুষ সাধু-সন্ত কিংবা সুফী-দরবেশের মতো তাদের চিন্তা-আচরন-কাজের মধ্যে কোন সংগতি নেই। এই যে অসংগতি এর সবই আসে উপলদ্ধির অভাব থেকে। ধর্ম যার আত্ন উপলদ্ধিতে আসেনি সে কি করে চিন্তা-আচরণে-কাজে ধার্মিক হবে। মুসলিম হিসেবে শুনে এসেছি সনাতনী ধর্মের লোকজন লিঙ্গের পুজো দেয়, সাপের পুজো দেয়, স্টুপিড না হলে এসবের পুজা কেউ করে নাকি! আর এই ইসলামের অনুসরণকারীরা তাদের ধর্ম নিয়ে কিংবা ধর্ম প্রচারককে নিয়ে যখন কেউ সমালোচনা করে তখন আক্রোশে, প্রতিবাদে ফেটে পড়ে, বোমায় আত্নহুতি দিয়ে নৈরাজ্য তৈরি করে। কোন এক নির্দিষ্ট ধর্ম যখন মানুষের আইডেন্টিটি হয়ে দাড়ায় তখন সবই স্বভাবিক হয়ে যায়, সবই চলে ধর্মের নামে। মারামারি, খুনাখুনি, হত্যা, লুট, যুদ্ধ সব। মানুষের মাঝে যে দ্বৈত স্বত্বা বিরাজ করে তা ধর্ম অনুসরণকারীদের দেখেই ভালোভাবে বোঝা যায়। একদিকে শান্তির বাণী প্রচার করে, অন্যদিকে অশান্তি সৃষ্টি করে এই ধর্মের নামে। যে ব্যাক্তি তার মাঝের এই দ্বৈত স্বত্বা যতটা জোর গলায় অস্বীকার করে, ততটা প্রকটরূপে তার আগ্রাসী আচরণ ধরা দেয়। এজন্য ধর্মের অনুসরণকারী যারা তাদেরকে ব্যাবহার করা হয়। নেতৃস্থানীয় ক্ষমতালোভীরা ধর্ম অনুসরণকারীদের তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পছন্দ করে, এভাবেই সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা পায়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসীন হয়, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

জার্মান ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হয়েছি, ক্লাশ শুরুর পর জানতে পারে ক্লাশের যিনি শিক্ষক তিনিও বাঙালী। বাঙালী হওয়াতে আমার অনেক সুবিধা হয়েছে। যেমন তাঁকে আমি পর্যবেক্ষণ করি কি করে উনি তার authenticity বজায় রেখে ওনার আবেগ-অনুভুতি, চিন্তা-চেতনা প্রকাশ করেন। দুই একটা শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করার সময় উনি আমাকে বাংলায় বলে দেন এক ফাঁকে। জার্মান ভাষায় বোঝাতে গিয়ে আটকে গেলে আলাদা করে এক ফাঁকে পরিষ্কার করে বাংলায় মনের ভাব বুঝিয়ে দেই ইত্যাদি ইত্যাদি। বাঙালী বলে আলাদা একটা টান অনুভব করেছি সব সময়, যেনো আমরা একই নৌকার যাত্রী। ওনার জন্মদিন পালন করার দিন। ক্লাশের সবাই মিলে বেশ বড়সড় আয়োজন করা হয়েছে, ইউক্রনীয় এক মেয়ে কেইক বানিয়ে এনেছে, গিফট কেনা হয়েছে, অনেকে অনেক ধরনের খাবার বানিয়ে এনেছে, ড্রিঙ্কস কেনা হয়েছে, কার্ড ও এক মিশরীয় মেয়ে বানিয়ে এনেছে। কেইক কাটার সময় প্রতিষ্ঠানের ল্যাপটপ থেকে গান বাজানো হয়েছে, সেই গান শেষ হলেই আমি এক ফাঁকে গিয়ে শাফিনের “আজ জন্মদিন তোমার” গানটি বাজিয়ে দিয়ে আসলাম। এক আরব ছেলে গিয়ে গানটা বন্ধ করে দিয়ে অন্য এক গান চালু করে দিলো, আরবি এক গান যা ওর পছন্দের বলে বোঝা গেলো। আরবি গান চালু করে দিয়ে সে খুবই খুশী, নাচ শুরু দিয়েছে গানের তালে। আমি তখন ওকে পর্যবেক্ষণ করছি, আর ভাবছি এতো এক ধরনের আগ্রাসী মনোভাব। আমার চালু করা গান ওর পছন্দ হতে হবে এমন না, গানটা আমি চালু করতামও না হয়তো যদিনা আমাদের শিক্ষক বাঙালী হতেন, তাই বলে গান চলাকালীন সময়ে ও আরবি গান শুরু করে দিতে পারেনা, সবাই বুঝবে এমন গান চালু করা উচিত ছিলো, সেটা জার্মান গান হলেই কি সংতিপূর্ণ হয় না?! ব্যাপারটায় আমি রেগে যায়নি, কিন্তু পছন্দ করিনি। এরপর আরও খেয়াল করলাম ক্লাশ চলাকালীন সময়েই তিন আরব দেশের ছাত্র-ছাত্রী নিজেদের মধ্যে উচ্চস্বরে আরবিতে কথা বলে, হাসাহাসি করে। ইন্সটাগ্রাম, ইউটিবের কন্টেন্ট প্লে করে নিজেরা মিলে মজা করে। আমার আশেপাশের যারা তাদের সাথে কথা বলার সময় অনেক সময় আমরা ইংরেজিতে সুইচ করি মনের ভাব পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্য। ওই আরব দলের থেকে সেই ছেলে এসে বলে তোমরা ইংরেজি ব্যাবহার করবে না, এই বলে সে হাসতে থাকে যেনো অনেক মজার কিছু বলে ফেলেছে। এরপর আসে রোজার সময়, রোজার দিনে অনেকেই রোজা রাখে, আমিও রাখি ঘোষণা না দিয়েই কিন্তু সেই আরব দলের ওরা প্রতিদিন নানা অজুহাত দেয়, রোজার সময় ওদের ক্লাশ করতে কত কষ্ট হয় হেনতেন, ক্লাশ তাড়াতাড়ি শেষ করে দেয়ারও তাড়া দেয়। অন্য যারা অমুসলিম তারা যখন খায় তখন এরা বিরক্ত হয়ে যায়, সেই আরব ছেলে এক খ্রিস্টান মেয়েকে বলে রোজার সময় খাওয়া-দাওয়া নিষেধ, বোঝা যায় রোজা রাখা অবস্থায় অন্যরা যখন খাচ্ছে সে সময় তার নিজেকে সংবরণ করতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। আর তাই সে fanatic আচরণ করছে, বাচ্চাদের মতোই তার দুনিয়া, সে যা করবে দুনিয়ার সবাই তাই করবে। এর বিপরীত কিছু হলে তা সে মেনে নিবেনা, পারলে শক্তহাতে প্রতিহত করবে; সেজন্য অন্যের উপর খবরদারী করাও ওর কাছে জায়েজ। এক আরব মহিলা জার্মানদের নামে কমপ্লেইন করছিলো এই বলে যে জার্মানরা রেসিস্ট, নাক উঁচা স্বভাবের, অন্যদের গ্রহণ করে নিতে পারেনা, অনেক ক্রিটিকাল, ওদের প্রতি করা জার্মানদের মন্তব্যগুলোও অনেক তীর্যক হয়ে থাকে। এই মহিলাই আমাকে মুসলিম বলে অনেক আপন মনে করে, আমার প্রতি বেশ সদয় আচরণ করে, মুসলিম ভাতৃত্বের সুবাদে ও আমাকে ওর দলের বলেই স্বীকার করে নিয়েছিলো। আমি যখন কিছু খেতে যাই হারাম-হালাল নিয়ে ও আমাকে সাবধান করে দেয়; আরবি শিখেছি কিনা, বুঝি কিনা এইসব জিজ্ঞেস করে। আন্তরিকতার সুরে বলে মুসলিম হয়েও কেনো আমি আরবি ভালো করে শিখিনাই, আরবি শিখলে তো ভালো হয়, যোগাযোগে সুবিধা হয়। আমিও আমার আরবি ভালো করে না শেখার কারন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি আন্তরিকভাবেই। তো হয়েছে কি এক কোরিয়ান মেয়ে ক্লাশের সবার জন্য খাবার এনেছে, আরব ছেলেটি খাবার দেখলেই পাগল হয়ে যায়, ও খাবে এই সময় সেই আরবি মহিলা এসে ওকে কি যেনো বলে আর ওই ছেলে খাবার না খেয়ে বিনে ফেলে দেয়। ওই মহিলার হাতের রান্না খুব ভালো, ওর বানানো খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় আর কি! সেই খাবার নিয়েও ওকে দেখা যায় সেই ক্লাশের দলের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে, যাকে যে পছন্দ করছে তাকে সে দেয়, যাকে পছন্দ করছে না তাকে একবার সাধছেও না। তখন মনে হলো যে মহিলা জার্মানদের নিয়ে এতো এতো কমপ্লেইন করলো সেই কিনা একইরকম আচরণ করে যাচ্ছে অন্যদের সাথে। সেই মহিলার কথা ভাবতে ভাবতেই Anaïs Nin এর কথা মনে পড়ে যায়ঃ “We see the world not as it is, but as we are.” সত্যি সেই আরব মহিলা জার্মানদের সেইভাবেই দেখে ঠিক যেমনটি সে। আমরা সবাই কি তাই দেখিনা? আমরা যেরকম দুনিয়াটা আমরা সেরকমভাবেই অবলোকন করি। এ যেনো একেক রঙয়ের কাঁচের মধ্যে দিয়ে একেকভাবে দুনিয়াকে দেখা, তাই আমাদের একেকজনের অভিজ্ঞতা একেক রঙয়ের হয়ে থাকে। আমার যে অভিজ্ঞতা সেটা আমার চোখের সামনে কি রঙয়ের কাঁচ আছে সেটার উপর নির্ভর করে, আমাদের সবার অভিজ্ঞতাই সে হিসেবে আপেক্ষিক(relative)। সেই মহিলা একদিন ক্লাশে অনেক কমপ্লেইন করছিলো বাচ্চাদের মতোই, কেনো জার্মান শিখতে হচ্ছে, কেনো এতো কষ্ট করতে হবে, কেনো তার মাতৃভাষায় সব চলেনা। যদিও সে জার্মানে এসেছে নিজের ইচ্ছেতেই, কেউ তার উপরে কিছু চাপিয়ে দেয়নি, এই দেশে এসে এই দেশে থাকার পরিকল্পনা তার নিজেরই, তারপরও তার মানতে কষ্ট হয়, জার্মান ভাষা শিখতে, জার্মান সংস্কৃতিতে চলতে; তার ক্ষমতায় থাকলে সে সবকিছু তার মর্জিমাফিক করে নিতো, নিতে চায়। আরবদের সাথে মিশে আমার কাছে যেনো পরিষ্কার হয়ে যায় ধর্মীয় আগ্রাসন কি? সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের উদাহরণ কেমন হতে পারে। আমিও কম যাই না এই প্রসঙ্গে ওই মহিলাকে জানাই জার্মান শিখতে না চাইলে বাংলা শেখো, তাহলে তোমার সাথে আমার যোগাযোগ করতে সুবিধা হতো, এই কথা বলে হাসতে হাসতে আমিও আমার জিহ্বা কামড়ে ধরি। সুফি কবি মাওলানা রুমি তাই বলে গেছেনঃ “The Ego is a veil between humans and God. In prayer all are equal.”

tamziadmin
tamziadmin
Articles: 91