Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

বান্ধবীর স্বামী, বেশ বন্ধুসুলভ। সে লোক আবার পাঁড় মাতাল, নেশা করে আর সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায়। মাঝেমাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম, নেশাখোর লোকটি কেনো এতো আন্তরিক? কেনো আমাকে দেখলেই খুশি হয়ে কথা বলতে এগিয়ে আসে? যে লোককে সবাই এড়িয়ে যায় সে কিনা আমার সাথে গল্প জমাতে পছন্দ করে! আমার মধ্যে কোন সমস্যা নেই তো?! যতসব উল্টাপাল্টা লোকজন আমার সাথে খাতির জমাতে আসে, আমিই হয়তো স্বাভাবিক নই, নাহলে এরকম হবে কেনো?! মাঝে মাঝে খটকা লাগে মনে, বান্ধবীর স্বামী সে আবার আমার উপরে ক্রাশ খায়নিতো?! বান্ধবীর কেমন লাগে যখন তার স্বামী আমাকে দেখে এতো খুশি হয়ে যায়? বান্ধবীকে চা-কফি বানানোর তাড়া দেয়, কিরকম ব্যাস্ত হয়ে ওঠে। আমার অস্বস্তি লাগে, আরও তো কত বান্ধবী আছে, আমার সাথেই কেনো? আমিই কি toxic? চরিত্রহীন হওয়ার সম্ভাবনা (potentiality) রাখি? নানা চিন্তা মনের ভেতর ঘুরতে থাকতো। তারপরও অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে হার মানতে হতো, একসাথে বসলে অনেক গল্প হতো, কথার পিঠে কথা না বলেও পারতাম না। সেখান থেকে ফিরে মনে মনে নিজেকে শাসাতাম, আর আলগা গল্প নয়। অন্য সবার মতো এই লোকের সাথে আমিও আর বেশী কথা বলবোনা। সেই বান্ধবীর স্বামী অনেক কিছুই বলেছিলো যেসব শুনে বিশ্বাস হয়নি। পাঁড় মাতাল লোক; লোকজনকে ইমপ্রেস করার জন্য কত কিছুই বলে, এইসব মনে করে উড়িয়ে দিয়েছি। এখন মনে হয় লোকটি যা দাবী করতো তা হয়তো সত্যি ছিলো। এমন দুই একটা কথা সে বলেছিলো যা কিনা সত্যি ঘটেছিলো।
আজ জীবনের এই পর্যায়ের উপলদ্ধি অন্যরকম; আমাদের আশেপাশের যারা স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করে তারা আসলে স্বাভাবিক নয়, তারাই আসলে ভীষণ রকমের অস্বাভাবিক। যারা আসলে স্বাভাবিক তাদেরকেই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। যে লোকটিকে পাঁড় মাতাল বলে সবাই এড়িয়ে চলতো, সে লোকটির সাথে কথা বলার সময় আমার কখনও মনে হয়নি সে অস্বাভাবিক। তার চিন্তা-ভাবনা যেমন পরিষ্কার ছিলো, আচার-ব্যাবহারেও সে ছিলো সংযত। তার সমস্যা যেটা ছিলো সেটা হলো চারপাশের সবকিছু সে পরিষ্কার দেখতে পেতো। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনের কারন, তাদের চিন্তা-ভাবনার স্বচ্ছতা, তাদের আচার-আচরনের অসংলগ্নতা, তাদের উদ্দেশ্য, তাদের মুখোশের আড়ালের প্রকৃত রূপ সব। কোন রকমের ফিল্টার ছাড়া চারপাশের মানুষজনকে প্রতিনিয়ত অবলোকন করা সহজ নয়, বিরাট মানসিক ধকলের ব্যাপার। কারও সাথে যোগাযোগ করার শুরু থেকেই যদি সেই লোকের চিন্তায়, কথায় ও কাজে অসংগতি নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে তাহলে কি করে সে যোগাযোগ উপভোগ করা যায়?! যে লোকটি অকৃত্রিম সম্পর্ক খোঁজে, যে লোক অন্তরের গভীরের চিন্তা-চেতনা নিয়ে আলাপ জমাতে চায়, সে লোক কি করে কেবল অর্থহীন বাচালতায় পরিতৃপ্ত হবে? আমাদের সমাজের চারপাশের বেশীরভাগই surface level আলাপ জমাতে পটু। সম্পর্কের গভীরতায় তারা বিশ্বাসী নয়, নিজের অন্তরের গভীরেও তারা ডুব দিতে ভয় পায়। তাই তারা ব্যস্ত রাখে নিজেদের সারাক্ষণ, আর যারা গভীতা চায় তাদেরকে তারা ভয় করে, এড়িয়ে চলে; খুঁড়ে খুঁড়ে কি না কি বের করে ফেলে, যাকিনা তারা নিজেরাই প্রাণপণে এড়িয়ে যেতে চায়!
যে লোকটি আমার সাথে এতোটা বন্ধুবৎসল ছিলো সে লোকটিকে নিয়ে আমি নিজে কিছু মন্তব্য করেছিলাম; যদিও সে মন্তব্য সত্য। সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবেসে নির্দয় হয়েছিলাম। মনে পড়ে লোকটির ব্যাপারে বলেছিলাম যে লোক মাতাল হয়ে পড়ে থাকে, বউয়ের আয়ে চলে, সে লোক যখন কাউকে আশ্বাস দেয় বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ানোর সেটা গুল ছাড়া কিছুনা। যদি সে লোকের সত্যিই কাউকে সাহায্য করার ইচ্ছে থাকে তো সবার আগে উচিত হবে তার নিজেকে ও নিজের বউকে সাহায্য করা। এই মন্তব্য করার পর তার সাথে আর দেখা হয়নি। এরই মাঝে সে বান্ধবীর স্বামী মারা যান খবর পাই। দূরদেশে থাকি, দেশে গিয়ে বান্ধবীর সাথে দেখা করে এসেছি, কিন্তু সেই বন্ধুবৎসল প্রাণোচ্ছল মুখটি আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি। সেই আলাপ, সেই দেখা-সাক্ষাৎ এতোটা অর্থপূর্ণ ছিলো তা কখনও বুঝতেই পারিনি। আজ যখন সে নেই তখন তার না থাকাটা প্রাণে বাজে। মাঝমাঝে মনে হয় তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার মুখোমুখি হওয়ার গ্লানিটুকু আর থাকলো না, কিন্তু বুকের মাঝে প্রায়ই চিনচিনে ব্যাথা জেগে উঠে যখন তখন তার জন্য দোয়া করি। সে যেখানেই থাকুক না কেনো, সুখে যেনো থাকে।