Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

জার্মানিতে থাকতে হলে অন্তত B1 লেভেলে ভাষা দক্ষতা থাকতে হয়। ভাগ্যক্রমে বাসার কাছেই একটা ফ্যামিলি সেন্টারে ভাষা শেখার ঝামেলাটা সেরে ফেলি। সেই ফ্যামিলি সেন্টারে নিয়মিতই যাওয়া হয় বাসার কাছে বলে। সেখানে একটি আর্ট থ্যারাপিষ্ট আসা শুরু করলো। বাচ্চাদের সাথে কখনও মায়েদের সাথে কখনও আবার মা-বাচ্চা সবার সাথে স্কালপচার, ছবি, সেলাই, দেয়াল- জানালায় আঁকাআঁকি, কাগজ, কাপড়, সুতা, বোতাম, উল, সেলাই মেশিন এরকম বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে। কখনও কখনও সেন্সরি এলিমেন্ট নিয়ে কাজ করে, কখনওবা শুধুই মিউজিকের তালে তালে নাচ হয়; আঁকাআঁকির ফাঁকে ফাঁকে ও আবার গল্পও বলে যায় দুই একটা। ওর সাথে কাজ করার আনন্দই ছিলো আলাদা, ওর সাথে এইসব কাজ করতে করতে আমাদের মধ্যে একটা সিনক্রোনাইজেশন তৈরি হয়ে যায়। আমার ভাষা দক্ষতা যদিও B1 লেভেলে, তবুও যোগাযোগের জন্য তা মোটেই সুবিধার না। ভাষায় হয়তোবা মোটামুটি দক্ষতা এসেছে, কিন্তু গভীরে গিয়ে আলাপচারিতা করার জন্য অনুপযুক্ত, যে কারনে হতাশায় হোক, কিংবা অপারগতার কারনেই হোক ওর কথার পিঠে কথা চালানোর সময় থেমে যেতাম। ও শুরু থেকে একদম কাছের মানুষের মতোই মিশে গেছে, কিন্তু আমি যখন ওর সাথে মিশছি তখন মনের ভেতর খটকা আসতো। ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি যেসব খবর ভেসে আসে সেই খবরের সাথে সাথে ইহুদীদের প্রতি আক্রোশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ওর সাথে যদিও আমার ভালো সময় কাটে, তবু মনে একধরনের অপরাধবোধও চলে আসে। মনে হয় মুসলিম হয়ে ইহুদী এক মহিলার সাথে খাতির, এরকম খাতির তো কোন মুসলিম মহিলার সাথে দেখা যায় না। হ্যাঁ ওই ফ্যামিলি সেন্টারে অনেক মুসলিম মহিলা আসে, কথা-বার্তা হয়; অনেক সময় যেচে গিয়ে আলাপ জমানোর চেষ্টাও করি, কিন্তু কেমন যেনো জমে না। ইরিসের সাথে যতটা সময় কাটাই সেটুকু সময় মনে হয় আমি আকাশে উড়ে যাই(my spirit flies so high)। অনুভব করি এক দূর্বার আকর্ষন, তখন মনে হতে থাকে এতো দূর্বার আকর্ষনের কারন কি? বিহ্বলিত হই যখন খবরে ভেসে আসে মুসলিমদের প্রতি ইহুদী আগ্রাসন। ইরিস মাঝেমধ্যে আমার উচ্চ প্রশংসা করে, সেটা কানে প্রতিধ্বনিত হয়, আমি আকাশে ভাসতে থাকি। আমি জানি এসবই মনের খেয়াল, নাহলে মানুষের প্রশংসায় উড়াউড়ির যেমন কিছু নেই, তেমনি সমালোচনায় পাতালে নামারও কোন কারন নেই। আমি নিজের সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি। এমন অনেক সময় হয়েছে যখন সাতপাঁচ ভেবে ইরিসের অনেক প্রোগ্রাম এড়িয়ে গিয়েছি, এমনকি সেই ফ্যামিলি সেন্টারে যাওয়াও বাদ দিয়েছি। এই সময় সাউথ কোরিয়ার এক মহিলা (সেও অনেক বন্ধুবৎসল), আমাকে বলে আশা কেউ যখন তোমার প্রশংসা করে তখন তুমি এতো চিন্তা না করে তা গ্রহণ করে নিবা, এটাই সহজ উপায়। তখন জিজ্ঞেস করে, তোমার প্রশংসা করলে পরে তুমি সেটা উড়িয়ে দাও কেনো? আমি তখন ওকে ভেবে জানাই, আমার অভিজ্ঞতায় বেশীরভাগ সময়ই মানুষ প্রশংসা করে ব্যাবহার করার জন্য, নাহয় ঠাট্টার চলে, কিন্তু যখন যেটা প্রশংসা করার কথা সেসময় তারা চুপ হয়ে যায়। আবার অনেক সময় দেখেছি সামনে অনেক প্রশংসা করে, আড়ালে বিস্তর বদনাম করে যা কিনা সব সময় আমার জন্য গোলমেলে মনে হয়; এজন্য কেউ যখন প্রশংসা করে তখন মনের অজান্তেই সেটা আন্তরিক বা শান্তনামুলক কিনা তা নিয়ে বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ি । তখন Seo-yeon জানায় এশিয়ান কালচার আমি জানি বলেই তোমাকে বললাম, কেউ প্রশংসা করলে তা নিয়ে নিবে, হোক তা জেনুইন কিংবা ফেইক। ওর কথায় সম্মতি জানিয়ে ইরিসের করা প্রশংসা উপভোগ করতে শুরু করলাম। চিন্তা করলাম ওর সাথে কাটানো সময় তো চমৎকার, সাতপাঁচ এতো না ভেবে অনেকটা ছেলের নাম করে ওর প্রায় সব প্রোগ্রামে যাওয়া শুরু করলাম। সেটা ব্যালেন্স করতে ওখানে আসা প্যালেস্টাইন মহিলার সাথেও অনেক গল্প করতাম। কিন্তু প্যালেস্টাইন মহিলা নিতান্তই সংসারী এক মহিলা, সেও আইটি লাইনের; এই লাইনে একটা জব পেয়ে গেলে ও খুশি। কিন্তু ঝামেলা হলো গিয়ে আমার মতো একজনের যেকিনা জানেনা সে কি করতে চায়। প্যালেস্টাইন মহিলাটি জানিয়েছিলো ওর এক পরিচিত প্যালেস্টাইন মহিলা আইটি লাইন ছেড়ে কিন্টারগার্টেনে কাজ নিয়েছে, সেটা তো আমি চাই না। আমার ইরিসের সাথে কাজ করতে ভালো লাগছে, কিন্তু ভবিষ্যতে আমি কি করবো সেটা আমার কাছে অস্পষ্ট। ইরিস আমায় জিজ্ঞেস করে যে আমি কি করতে চাই, আমার নিজের কাছেও কোন উত্তর জানা নাই। আমাকে কিছু বলে লাভ নেই জেনে আমার সামনেই Berta এর (জার্মান ভদ্রমহিলা, ওর sprachcafé তে আমি প্রায় রেগুলার যাই) সাথে ও আফসোস করছে, কেনো এরকম একজনের ট্যালেন্ট বিফলে যাবে (ওর কথায় উষ্ণতা যে কেউই ধরতে পারবে)। ও একদিন জিজ্ঞেস করলো জার্মান ভাষা কেনো আরও শিখি না, ওকে জানাই যে জার্মান যখন বলতে যাই তখন মনে হয় আমি এমন কেউ একজন হওয়ার ভাণ করছি যা আসলে আমি না (fake personality)। আর আমি খেয়াল করেছি ভাষা পরিবর্তনের সাথে সাথে আমার ব্যাক্তিত্বেও ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসে, Like I used to express something in certain ways, now those are completely changed। ওকে আরও জানাই মাতৃভাষায় তো আমার দখল ভালো, তারপরও তো অনেক সময় মনে হয় মানুষজন আমাকে ঠিক যেনো বুঝতে পারেনা, কিংবা আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা ঠিক মতো বোঝাতে পারছিনা। তাই ভাষা শেখায় আগ্রহ পাই না। তখন ও জানায় “হুম বুঝতে পেরেছি তুমি চাও authenticity, ভাষায় দক্ষতা বাড়লে এই সমস্যা আর থাকেনা”।ও আরও বলে, “আমি বুঝতে পারছি ভাষা প্রকাশের সময় যা তুমি প্রকাশ করতে চাও সেটা পারছনা বলেই তুমি ভাষা শেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছ”। এরপর সে জানায় তার পরিচিত অনেকের কথা যারা তাদের শেখা প্রত্যেক ভাষায় তাদের স্বকীয়তা প্রকাশে দক্ষতা অর্জন করেছে। ইরিসের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মূলত আমি জার্মান ভাষা B2 লেভেল শেষ করি। যখন আমি B2 লেভেলের কোর্সে ভর্তি হই তখন ইরিসের অনেক প্রোগ্রাম মিস করি, এরমধ্যে ইরিস সেই ফ্যামিলি সেন্টারের কাজ গুটিয়ে অন্যখানে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু যতদিন ইরিস সেই ফ্যামিলি সেন্টারে এসেছে ততদিনে আমার অনেক থ্যারাপি হয়ে গেছে মনের অজান্তেই। সেইসব ডিটেইলস বর্ণনা করতে গেলে মহাউপাখ্যান হয়ে যাবে। ইরিস একটি ফুলের নাম, জার্মানিতে যে ফুলের নাম রেগেনবগেন গটিন (regenbogen gottin- রংধনুর দেবী) আমার ক্ষুদ্র জীবন অভিজ্ঞতায় যে কিনা মেঘ সরিয়ে রংধনুর সাত রঙয়ের শোভা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। ওর ভালোবাসা আমি অনুভব করি, আর ও আমার ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে। ইরিস এক ফাঁকে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতের হেডলাইনসহ এক পত্রিকা আমার সামনে মেলে রাখে, কিন্তু আমার মধ্যে আর কোন রাগের উদ্গীরণ হয় না; বরঞ্চ শান্তমনে, আনন্দ আর ভালোবাসার ভেলায় ভেসে ওর সাথে আমিও কাচের বিশাল জানালাটা (fenster এ) রং-তুলি নিয়ে রাঙিয়ে তুলি সাত রঙয়ের বাহারে।
(প্রকৃত নাম ও দেশগুলো উল্লেখিত ব্যাক্তিদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে গোপন রাখা হয়েছে)